শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

এ কেমন পরিচয় ? - লেখক: আকাশ আহমেদ

এ কেমন পরিচয় ?


জন্মের আগে আমার কোনো নাম ছিল না।
না কোনো ধর্ম, না কোনো জাত, না কোনো বিভাজন।
আমি ছিলাম শুধু এক নিঃশব্দ স্পন্দন- একটি প্রাণ, যে পৃথিবীতে আসার অপেক্ষায়।

মায়ের গর্ভে আমি কখনো শুনিনি -
“তুমি হিন্দু হবে”,
“তুমি মুসলিম হবে”,
“তুমি অন্য কিছু হবে।”

আমি শুধু শুনেছি -
একটা হৃদয়ের শব্দ- ধক ধক ধক…
যেখানে ভালোবাসা ছিল, কিন্তু কোনো বিভাজন ছিল না।

তারপর একদিন আমি জন্ম নিলাম।
আমার প্রথম কান্না পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়লো-
কিন্তু সেই কান্না থামার আগেই
আমার কানে ভেসে এলো-

“নাম রাখো… আকাশ।”
আমি তখনও জানতাম না-
এই নামের সঙ্গে আমার জন্য আরেকটা অদৃশ্য শেকল অপেক্ষা করছে।

কিছুক্ষণ পরই কেউ বললো-
“এ আমাদের ধর্মের সন্তান।”

আমি বুঝলাম না।

কারণ তখনও আমি মানুষ হওয়াটাই ঠিকমতো বুঝে উঠিনি।

ছোটবেলায় আমি খুব সাধারণ ছিলাম-
হাসতাম, খেলতাম, দৌড়াতাম।
আমার বন্ধু ছিল অনেক-
তাদের মধ্যে ছিল অপু, রোহন, সুমন, আয়েশা, রিমি…

আমরা কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করতাম না-
“তুই কোন ধর্মের?”

কারণ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল-
“তুই আমার বন্ধু কিনা।”

একদিন বিকেলে আমরা সবাই মিলে খেলছিলাম।
হঠাৎ অপুর মা এসে তাকে টেনে নিয়ে গেলেন।
আমার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত চোখে বললেন-

“ওদের সঙ্গে বেশি মিশিস না।”

আমি থমকে গেলাম।
“ওদের” মানে?
আমি কি আলাদা?

সেদিন প্রথমবার আমি নিজের ভেতরে একটা প্রশ্ন অনুভব করলাম-

আমি কি শুধু ‘আকাশ’?
না কি তার চেয়েও কিছু?

স্কুলে গিয়ে সেই প্রশ্ন আরও বড় হলো।
একদিন ক্লাসে শিক্ষক বললেন-
“তোমাদের ধর্ম অনুযায়ী আলাদা লাইনে দাঁড়াও।”

সবাই দাঁড়িয়ে গেলো-
কেউ ডানে, কেউ বামে।
আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলাম।

শিক্ষক বললেন-
“আকাশ, তুমি ওদিকে যাও।”
আমি ধীরে ধীরে হাঁটলাম।
কিন্তু মনে হচ্ছিল-
আমি যেন নিজের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি।

সেদিন বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করলাম-
“মা, আমি কি শুধু মানুষ হতে পারি না?”
মা চুপ করে রইলেন।
তার চোখে আমি জল দেখলাম।
তিনি শুধু বললেন-
“সবাই পারে না, বাবা…”

বড় হতে হতে আমি বুঝতে শুরু করলাম-
এই পৃথিবী নাম আর ধর্মের মধ্যে মানুষকে ভাগ করে রাখে।

ইতিহাসের বই খুলে দেখি-
রক্তের দাগ।
ধর্মের নামে যুদ্ধ, হত্যা, দাঙ্গা…

আমি ভাবলাম-
যে ধর্ম মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়,
সেই ধর্মের নামেই এত ঘৃণা কেন?

কলেজে উঠার পর আবার অপুর সঙ্গে দেখা।
অনেকদিন পর।
সে আমাকে দেখে হাসলো-
“কিরে আকাশ! ভুলে গেছিস নাকি?”
আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
সেই আলিঙ্গনে কোনো ধর্ম ছিল না-
ছিল শুধু হারানো বন্ধুত্ব।

আমরা আবার একসাথে সময় কাটাতে লাগলাম।
মনে হচ্ছিল-
সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু পৃথিবী এত সহজে ঠিক হয় না।

এক সন্ধ্যায় শহরে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো।
খবর এলো-
দাঙ্গা শুরু হয়েছে।
রাস্তা জ্বলছে, মানুষ দৌড়াচ্ছে, চিৎকার…
ভয় ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

হঠাৎ ফোন এলো-
“অপুদের বাড়িতে হামলা হয়েছে!”
আমার বুক কেঁপে উঠলো।
আমি সবকিছু ভুলে দৌড়ে গেলাম।

পৌঁছে দেখি-
বাড়ির দরজা ভাঙা, দেয়ালে আগুনের দাগ,
চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্মৃতি।

অপু কোণায় বসে আছে-
তার চোখে ভয়, ঠোঁট কাঁপছে।
আমি ধীরে ধীরে তার কাছে গেলাম।
সে আমাকে দেখে হঠাৎ জড়িয়ে ধরলো-
আর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
“আকাশ… আমরা কি ভুল করেছি?”

আমি স্তব্ধ।

আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

সে আবার বললো-
“বন্ধু হওয়াটা কি অপরাধ?”

আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
আমি শুধু তাকে শক্ত করে ধরে রাখলাম।
সেই মুহূর্তে-

আমরা কেউ কোনো ধর্মের ছিলাম না।
আমরা শুধু দুটো মানুষ-
যারা ভেঙে পড়েছে।

সেই রাতটা আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটালাম।

তারারা ঝলমল করছিল।
চাঁদ নিঃশব্দে আলো ছড়াচ্ছিল।

আমি ভাবলাম-
এরা কি কখনো মানুষকে ভাগ করে?

না।

প্রকৃতি কাউকে আলাদা করে না।
শুধু মানুষই করে।

আমি লিখতে শুরু করলাম।
আমার ব্যথা, আমার প্রশ্ন, আমার প্রতিবাদ-
সব কাগজে ঢেলে দিলাম।

“আমি জন্মের আগে কিছুই জানতাম না,
তবু জন্মের পর আমাকে পরিচয়ের ভারে চাপা দেওয়া হলো।

আমি কি মানুষ হওয়ার অধিকার রাখি না?
আমি কি শুধু ভালোবাসতে পারি না-
কোনো শর্ত ছাড়াই?”

একদিন আমি মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম।
বললাম-

“আমার নাম আকাশ।
এই নামের আগে বা পরে কোনো ট্যাগ লাগাতে চাই না।

কারণ আমি বিশ্বাস করি-
মানুষ হওয়াটাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।

যদি ধর্ম আমাকে মানুষ থেকে আলাদা করে,
তাহলে সেই ধর্মের মানে কী?”

পুরো হলঘর নীরব হয়ে গেলো।

কেউ কিছু বললো না-
কিন্তু অনেকের চোখে জল ছিল।

সেই জলই প্রমাণ-
মানুষ এখনও বেঁচে আছে।

আজও পৃথিবী পুরো বদলায়নি।
এখনও ধর্মের নামে বিভাজন হয়,
এখনও মানুষ মানুষকে আঘাত করে।

কিন্তু আমি বিশ্বাস হারাইনি।

কারণ আমি দেখেছি-
ধ্বংসের মাঝেও বন্ধুত্ব বেঁচে থাকে,
ভয়ের মাঝেও ভালোবাসা জন্ম নেয়।

আমি আজও সেই প্রশ্ন করি-
“আমি কি মানুষ পরিচয়ে বাঁচার অধিকার রাখি না?”

হয়তো একদিন-
কোনো শিশুকে জন্মের পর বলা হবে না-
“তুমি এই ধর্মের।”

বরং বলা হবে-
“তুমি মানুষ, এটাই তোমার পরিচয়।”
সেই দিন-

পৃথিবী সত্যিই সুন্দর হবে।

আর আমি…
সেই দিনের অপেক্ষায় আছি-
চোখ ভরা স্বপ্ন আর বুকভরা ব্যথা নিয়ে।

কারণ আমি আকাশ-
আমি সবার, আবার কারও না।

আমি শুধু একজন মানুষ হতে চাই…


— শেষ —



তুমি মিলিয়ে নিও... - উজ্জ্বল কান্তি দাশ

 
উজ্জ্বল কান্তি দাশ


কতবার আমি ঝরে পড়া
তারাকে দেখে, 
মনে মনে তোমাকেই চেয়েছি। 
যতবার কোন মন্দির মসজিদ, 
গীর্জা প্যাগোডা সামনে পড়েছে, 
ততবার এই হাত দুটি উঠেছে, 
তোমারই মঙ্গল প্রার্থনায়, 
তাই চেয়েছি শুধু, 
তুমি যা চাও। 
তোমার জন্য হৃদয় মাঝে
যে ব্যথা অনুভব করি, 
সেটি আমার একান্ত নিজস্ব, 
একান্ত আপন ব্যথা। 
যা আমি কাউকে বলবো না, 
কোনোদিনও বোঝাতে যাবো না কাউকে। 
জলাশয়ে ঢিল ছুঁড়লে যেমন, 
তা থেকে সৃষ্ট তরঙ্গ, 
সমস্ত জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে, 
ঠিক তেমনই তোমার মুখনিঃসৃত সব কথাই, 
আমার হৃদপিণ্ডে তরঙ্গের সৃষ্টি করে, 
আর তা ছড়িয়ে পড়ে, 
আমার সমস্ত শরীরে। 
আমার বুকে ধুকপুক করে না, 
সেখানে ধ্বনিত হয় একটি নাম, 
তোমার নাম। 
কখনো পরীক্ষা করতে চাইলে, 
এই বুকে কান পেতে দেখো শুনতে পাবে। 
আমার পৃথিবী জুড়ে, 
শুকনো পাতার মর্মর সুরের হাহাকার, 
সমুদ্রের ঢেউ আর গর্জন দেখে
মনে হয় সমুদ্র কত উৎফুল্ল! 
কেউ বোঝেনা তাকে 
তীরকে ছোঁয়ার তার কি ব্যাকুলতা! 
ঠিক তেমনই আমাকে দেখেও সবাই ভাবে, 
কতটা প্রাণবন্ত! 
এই সবকিছুর মাঝেও যে, 
কতটা বিষাদ আমাকে ঘিরে থাকে, আছে। 
এই আমি যে একটা জীবন্ত লাশ, 
কেউ জানে না, আমি জানাতেও চাইনা।
আমি ভালো কি মন্দ, 
সে বিতর্কে যেতে চাই না, 
শুধু এটুকু বলবো, 
যদি কাঁচের মতো আমাকে, 
টুকরো টুকরোও করে ভেঙ্গে দাও, 
দেখবে সেই ভাঙ্গা টুকরোগুলোর প্রতিটিতে, 
শুধু তুমিই আছো,তুমিই থাকবে, 
এখন তুমি বুঝবে না, 
যে দিন চিরতরে হারিয়ে যাবো, 
সেই দিন তোমার উপলব্ধি হবে, 
সেই দিন তুমি বুঝবে,
সেই দিন তুমি খুঁজবে,
আমি বলে গেলাম, 
তুমি মিলিয়ে নিও।

চাঁদ তুমি সাক্ষী থেকো... - সালাম মালিতা

 
সালাম মালিতা 


চাঁদ তুমি সাক্ষী থেকো 
কত বিনিদ্র রাত কেটেছে-
শুধু তুমি আর আমি!
ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে 
খোলা বাতায়নে ঈশারায় কথা হয়,
শত অভিযোগে তোমার 
মেঘের আড়ালে লুকোচুরি দেখি।
তুমিও আমার প্রিয় মানুষের ন্যায়
বড্ড অভিমানী!

চাঁদ তুমি সাক্ষী থেকো 
কত স্বপ্নের খেয়া পারের-
অসমাপ্ত গল্প জানো!
তারাদের মত ক্ষুদ্র আশাদের
খসে পড়া দেখেছি দু'জনে, 
জেগে থাকা নত্রদের কষ্ট শুনে 
তাদের বন্ধু করে নিই।

চাঁদ তুমি সাক্ষী থেকো 
জোনাকপোকার আলোয়-
যে আবেগের বুনন হয়!
একমাত্র তুমিই জানো
শুকনো বালিশে পতিত 
জলবিন্দুর সংখ্যা কত,
লুকিয়ে রাখা ছবি দেখেই
বিষাদের চাদর পরি।
আমার সকল অন্তর্লীন কষ্ট 
তোমার নখদর্পনে, 
আঁকিবুঁকি ছায়া ফেলে
তুমি পুরোটাই জানো।

চাঁদ তুমি সাক্ষী থেকো 
আমার সেই প্রিয় মানুষটার-
তোমার অধিক কলঙ্ক ছিল!
সেদিন দু'জনের 
তোমার সাথে পরিচয় হলেও
আজ সে অন্যের সাথে
তারা গোনে, 
রঙিন আলোর ভিড়ে 
তোমার সামনে অঙ্গীকার করলেও-
অন্যের বুকে সুখ খোঁজে।

যতদিন তুমি রাতের অমানিশা ভেদে 
কালিমা মুছতে উঠবে,
ততদিন সাক্ষী দিও-
পাড়াগাঁয়ের ছোট্ট ঘরের 
ছোট্ট বাতায়ন খুলে-
আজও একটা ছোট্ট ছেলে
পুরানো সেই সঙ্গীর সাথে বসতে চায়,
তোমার সাক্ষীতে আধ্যাত্মিক মিলনে
দু'জনার তরে দু'জনে মিশে
অমর হতে চায়!

আজকের মীরজাফর... - সর্বানী দাস

 
সর্বানী দাস 


মীরজাফররা জন্মায় বলে হয় যে দেশের ক্ষতি,
নবাব বুদ্ধি ধরে তবু সহজ সরল অতি।

পিঠে ছুঁরি মারে তাকে, তবু বিশ্বাস করে,
সংশোধনের সুযোগ দিয়ে বন্ধুর হাত ধরে।

নবাব চেনে মীরজাফরকে, চেনে প্রধান মন্ত্রী ,
রাজ্য ধ্বংস করার জন্য মীরজাফররাই ষড়যন্ত্রী।

নবাব তিনি উদারতায় রাখেন নিজের চিন্তা,
মীরজাফরের  মনে মাদল ধ্বংসে তাধিন ধিন তা।

নবাব কর্মে বিশ্বাস রেখে রাখেন নিজের সৃষ্টি,
মীরজাফদের চরিত জানতে পড়তে হবে হিস্ট্রি।

নিজের পাতা নানান ফাঁদে নিজেই বন্দি হলে,
কালো বিষের নীলচে ছোঁয়া লেখার হলাহলে।

কণ্ঠে বিষ পান করে নবাব মুচকি হাসে,
মীরজাফররা  ভালো সাজার অভিনয়ে ভাসে।

মুখে বলে এই করেছি ওই করেছি আমি,
কৃতজ্ঞতা রাখেন নবাব রুচি যে তার দামি।

কিন্তু নবাব পড়লো হিস্ট্রি প্রমাণ পেল হাতে,
মীরজাফরও কম যায় না খসড়া লিখলো রাতে।

হুমকি দিল ভাবলো মনে নবাব চমকে যাবে,
তার মতন আর বেঈমান মানুষ কোথায় বা আর পাবে।

বলছি শুনুন নবাব মশাই আমরা আছি দেশে,
সৎ সততা সত্য নিষ্ঠা সুস্থ চর্চায় মেশে

দেবস্মিতার কথা... --জয়দীপ বসু

 

জয়দীপ বসু


সুদীর্ঘ ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার পেশায় আত্ম নিবেদিত। মানুষ গড়ার কারিগর। তারুণ্যের স্বপ্ন বিলসিত দিনে ভালো ছাত্র, ছাত্রী তৈরি করার ঐকান্তিক অভিপ্রায়ে চরম অনিশ্চিত এই পেশায় আসা। আজও একইভাবে চলেছি। কারণ পড়াতে ভীষণ ভালো লাগে। আদর্শ ও মূল্যবোধকে জীবনে সবসময় অগ্ৰাধিকার দিয়ে চলি।

সালটা ২০১৬, এপ্রিল মাস। I. C. S. E  বোর্ডের ছাত্রী দেবস্মিতাকে একাদশ শ্রেণীতে বাংলা পড়াতে শুরু করলাম। ওদের ফ্ল্যাটে গিয়ে পড়াতাম। আমার বাড়ির কাছেই। ও একাই পড়তো। বিনিময়ে গুরু দক্ষিণা অনেক বেশি পেতাম। প্রথম দিন পড়িয়েই খুব ভালো লেগেছিল। ভীষণ জ্ঞান পিপাসু, বিনয়ী, হাসি-খুশি, পড়াশোনায় বেশ ভালো। ইংরাজী মাধ্যমের ছাত্রী হওয়ায় বাংলায় সামান্য দুর্বল। কিন্তু ভালো করার অদম্য ইচ্ছা। সপ্তাহে একদিন করে পড়ানোর কথা থাকলে ও ওর আগ্ৰহে ভীষণ খুশি হয়ে মাঝে মাঝেই একস্ট্রা ক্লাস দিতাম। ও প্রায় রোজই পড়া করে রাখতো। কোনো দিন শারীরিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে পড়া করতে না পারলে ক্ষমা চেয়ে নিত।

 I. C. S. E 10 এর ফল বেরোলে দেখা গেল দেবস্মিতা বাংলায় ৯০ পেয়েছে। নাইন, টেনে ও অন্য টিচারের কাছে বাংলা পড়তো। যাইহোক আমি I. S. C র জন্য আরো জোরদার গতিতে পড়ানো শুরু করি। আমার অনেক ছাত্র, ছাত্রীর মতো দেবস্মিতা ও আমাকে "তুমি " বলে সম্বোধন করতো। আমি অবশ্য এই ব্যাপারটায় খুব একটা গুরুত্ব দিই না। অনেকেই আমাকে "দাদা তুমি", "স্যার তুমি" এসব বলে সম্বোধন করে থাকে। পড়াশোনাটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে বেশি আপন ভেবে "তুমি" বলে থাকে। তবে বেশিরভাগ " আপনি " এবং "স্যার বলেই সম্বোধন করে।

যাইহোক দেবস্মিতা এবং ওর বাবা, মার অমায়িক ব্যবহার আমাকে ভীষণভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। ইলেভেন থেকে টুয়েলভে ওঠার সময় দেবস্মিতা বাংলায় বেশ ভালো ফল করে। ওর বাবা, মা আমাকে অভিনন্দন জানান। 

টুয়েলভে আরো মন দিয়ে পড়াশোনা করতে থাকে। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হওয়ায় ওর মারাত্মক চাপ ছিল। তাও ও প্রায় রোজ পড়া করে রাখতো। আমি ও ওকে ভালো করানোর জন্য নিজেকে প্রায় উৎসর্গ করেছিলাম। একস্ট্রা ক্লাস ও সময়ের কোনো হিসাব  ছিল না। এদিকে সময় এগিয়ে চলতে থাকে খুব দ্রুত তাল, লয়, ছন্দে। ২০১৮ এর I. S. C পরীক্ষা শুরুর কয়েকদিন আগে ওকে শেষ বারের মতো পড়াতে গেলে ও আমাকে দেখে কেঁদে ফেলে। বলে "স্যার তুমি আমাকে  বাংলায়  আগ্ৰহী করে তৈরি করেছো। তোমার মতো ভালো শিক্ষক আমি এর আগে কাউকে পাই নি। কিন্তু আর তো দেখা হবে না"। ওর এই আচরণে আমি ও ভীষণভাবে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। ওকে বুঝিয়ে বলি "দেখো সব কিছুর একদিন শুরু ও শেষ আছে। তাই কান্নাকাটি না করে মন দিয়ে পরীক্ষা দাও। আমি সরাসরি পড়াতে না এলে ও ফোনে কথা বলবে। অনেক প্রাক্তন ছাত্র, ছাত্রীই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে"। তবুও ও কাঁদতে থাকে। ওর মাও সেদিন ওকে শান্ত করতে পারেন নি। যাইহোক ২ ঘন্টা পড়ানোর পর আমি শেষ বারের মতো চলে আসি।

পরের দিন সকাল সাড়ে ১১ টায় দেবস্মিতার বাবা ফোন করে জানান আমি চলে আসার পর ও নাকি ভীষণ কান্নাকাটি করেছে। বলেছে বাংলা পরীক্ষার এখনও কিছুটা দেরি আছে। এই ক' দিন ও অন্যান্য পরীক্ষার মাঝে আমার কাছে বাংলা পড়া চালিয়ে যেতে চায়। ওর বাবা আমাকে আবার পড়াতে যেতে অনুরোধ করেন। আমি ওর আবেগের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে আবার পড়াতে যাই এবং বাংলা পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত পড়ানো চালিয়ে যাই। প্রত্যেক দিনই আবার ওকে শেষ দিন সম্পর্কে কাউন্সেলিং করতাম। 

জীবনে বহু ছাত্র, ছাত্রী পড়িয়েছি এবং এখনও পড়িয়ে চলেছি। প্রত্যেকেরই একদিন পড়ানোর শেষ দিন আসে। শেষ দিনে কম, বেশি সবাই কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, মন খারাপ করে। আমারও খারাপ লাগে। কিন্তু এটাই জাগতিক নিয়ম। শুরু থাকলে তার শেষও আছে। কিন্তু দেবস্মিতার মতো এতটা আবেগ আমার প্রতি কেউ কোনো দিন দেখায় নি। 

I. S.C তে বাংলা সহ সব বিষয়ে ভালো ফল করার পর স্থাপত্য বিদ্যায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করে ও আজ অনেক উপরের স্তরে। বিধাতার অমেয় আশীর্বাদ ওর উপরে আছে। আমি তখনই ভবিষ্যদ্‌বাণী করেছিলাম যে ও একদিন অনেক বড় হবে।  আজ তা সত্যি হয়েছে। ওর মতো ভালো মেয়ে( সব দিক থেকে ভালো ছাত্রী) আমি এখনো পর্যন্ত খুব খুব কম পেয়েছি। ও আরো অনেক বড় হবে।

ক্ষুধার শহরে ফেরিওয়ালা... - মুন্নাফ সেখ

 

কবি - মুন্নাফ সেখ


রোদে পোড়া মুখ, ঘামে ভেজা গায়, পথ চলা অবিরাম,
শহর যখন এসি-তে ঘুমায়, আমার জীবন ঘাম।
পিঠের ওপর পাহাড় সমান ব্যাগের বোঝা ভারী,
সবার ক্ষুধা মেটাতে গিয়েও নিজের শান্তি হারি।

ম্যাপের কাঁটায় জীবনটা আজ সময়ের পিছে ছোটে,
দেরি হলেই গালিগালাজ আর রেটিংটা কমে জোটে।
তপ্ত পিচে ট্রাফিক জ্যামে ফুরিয়ে যায় যে বেলা,
আমার খিদের খবর রাখে না নাগরিক এই খেলা।

কারো দুয়ারে বিরিয়ানি দিই, কারো বাড়িতে ওষুধ,
আমার নিজের ঘরেই অভাব, মেটেনি ঋণের সুদ।
কলিং বেলটা বাজানোর পরে কেউ দেখে রুক্ষ চোখে,
মানুষ আমায় রোবট ভাবে, রক্ত-মাংস দেখছে ক'কে?

অচেনা গলিতে পথ হারাই আমি, গুগলও দেয় ফাঁকি,
রন্ধ্র বেয়ে ঘাম ঝরে পড়ে, ক্লান্তি যে আর বাকি।
আপনার ঘরে ডাইনিং টেবিলে খাবারের মেলা যখন,
রাস্তার ধারের জলের কলটা আমার ভরসা তখন।

আমারও তো এক ছোট্ট বাড়ি, আছে এক বুড়ো মা,
পথ চেয়ে থাকে অবুঝ মেয়েটি, ভুলতে তো পারি না।
বৃষ্টিতে ভিজে পথ চলি যখন, শীতে কাঁপে থরথর বুক,
স্মার্টফোনের ওই স্ক্রিনেতে খুঁজি হারানো দিনের সুখ।

বখশিশ দিতে কার্পণ্য করে, মুখ ঘোরে সব পাশে,
জানেন কি এক টাকা কমলে স্বপ্ন বিষাদে ভাসে?
সবার অভাব মিটিয়ে যখন ঘরে ফিরি মাঝরাতে,
এক চিমটি নুন-লঙ্কা দিই শুকনো শীতল ভাতে।

দুর্ঘটনার ভয়টা তাড়া করে মোড়ে আর বাঁকে,
জীবনটা মোর সস্তা বড়, কেউ কি মনেতে রাখে?
আমি তো রোবট নই গো বন্ধু, আমারও আছে এক মন,
অবহেলা আর যন্ত্রণাতে কাটে আমার প্রতিটি ক্ষণ।

অচেনা শহর, অচেনা মানুষ, আমি এক যাযাবর,
হাসির আড়ালে চাপা আছে মোর এক সমুদ্র ঝড়।
বুক চিরে যদি দেখানো যেত জমা থাকা দীর্ঘশ্বাস,
বুঝতেন এই শহরটা আমার এক নীল কারাবাস।

এ কেমন পরিচয় ? - লেখক: আকাশ আহমেদ

এ কেমন পরিচয় ? জন্মের আগে আমার কোনো নাম ছিল না। না কোনো ধর্ম, না কোনো জাত, না কোনো বিভাজন। আমি ছিলাম শুধু এক নিঃশব্দ স্পন্দন- একটি প্রাণ, যে...

জনপ্রিয় পোস্ট