ছোট থেকেই আশিকের লেখালেখি করতে বেশ ভালো লাগে, বাবা-মা কেউই স্কুলের গণ্ডি পার না করলেও আশিকের সাহিত্যের প্রতি মারাত্মক টান কাজ করে। স্কুল জীবনে নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন কয়েকটি পদ্য লিখলেও স্কুল ম্যাগাজিন বার হয়নি সেবার, আর যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে লেখাগুলোও হারিয়ে যায়। লেখক হওয়ার অদম্য ইচ্ছায় বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হয়েও বাংলা সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করতে চায়। তাই সময় সুযোগ মত ফুল, পাখি, লতাপাতা, প্রান্তিক মানুষ, প্রতিবন্ধী, স্বদেশপ্রেম, বঞ্চিত মানুষ এবং সামাজিক বিভিন্ন গোঁড়ামি লেখায় তুলে ধরে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঠাকুমার মুখে গল্প শুনে এবার আগ্রহ জন্মালো অন্য একটা বিষয় নিয়ে। কিন্তু লেখকের বাস্তবিক অভিজ্ঞতা ব্যতীত সেই লেখায় আবার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় না। তাই আশিক ছুটল নিজের গন্তব্যে।
বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে চলল শহর লাগোয়া সবচেয়ে বড় নিষিদ্ধ পল্লীর দিকে, যেখানে টাকার বিনিময়ে মনোরঞ্জনে শরীরের কেনাবেচা চলে। ইতিপূর্বে কখনো না আসায় সামাজিক উৎকণ্ঠা কাজ করছিল আশিকের। হুটোপাটা করে পৌঁছে গেল পল্লীর ভিতর। দেখল সেখানে শয়ে শয়ে মেয়ের অর্ধনগ্ন হয়ে খদ্দের ধরার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। মাসির নিকট পৌঁছানোর পূর্বেই আশিককে নিয়ে তারা টানাহেঁচড়া করতে লাগল। কেউ কেউ বলল - ' এ ছোঁকরা আমার ঘরে আয়, অনেক মজা পাবি '। নিজের শক্তি সামর্থ্য দিয়ে কোনোমতে পাশ কাটিয়ে শেষমেশ পৌঁছে গেল মাসির কাছে।
আশিক : মাসি আমি আজকে প্রথম, তোমার এখানকার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের ঘরে যেতে চাই। আমাকে কত টাকা দিতে হবে বল।
মাসি : কে বে ছোকড়া তুই? তোকে তো আগে কখনো দেখিনি।
আশিক : আমি এই শহরের কাছাকাছি থাকি। বল আমাকে কত টাকা দিতে হবে।
মাসি : তোর মনে হচ্ছে খুব জোর পেয়েছে। প্রথমবার নাকি?
আশিক : সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ের কাছে যাব। কত লাগবে?
মাসি : গুনে গুনে পাঁচ হাজার টাকা লাগবে, একদম খাসা মাল। পরে কিন্তু ফেরত চাইলে ফেরত পাবি নে, বলে দিলাম।
আশিক : না না ফেরত চাইব না। কোন ঘরে আছে আমায় দিয়ে এসো।
মাসি : তা ক*ণ্ডোম সাথে এনেছিস তো? ক*ণ্ডোম ছাড়া করলে আরও পাঁচশ বেশি লাগবে বলে দিলাম।
আশিক : সব আছে আমার কাছে। আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চল।
মাসি : এর দেখি মাথায় উঠে গেছে। খা*নকির ছেলের খুব জলদি।
মাসি তীব্র স্বরে ডেকে বলল, এই পাম্মি এই ছোকরাটাকে নিয়ে মধুবালার ঘরে দিয়ে আয়। দু'তলার আট নম্বর ঘরে আছে। খুব দামি মাল ওটা। এই ছোকরা এর পাছায় হাত বোলাতে বোলাতে চলে যা দু'তলায়, দেখগে তোর মাগি তোর জন্য অপেক্ষা করছে। আশিক সেই যৌনকর্মীর পিছু পিছু চলল মধুবালার ঘরের দিকে। ঘরের কাছাকাছি এসে পাম্মি বলল, দু'ঘন্টা ধরে খুব মজা কর, একদম খাসা। আমি গেলাম। আশিক দরজার কাছে গিয়ে দরজায় খটখট শব্দে আওয়াজ দিল। তারপর বলল;
আশিক : আমি কী ভিতরে আসতে পারি?
মধুবালা : কে রে তুই ন্যাকাচোদা? করতে এসে এত ভদ্র সাজছিস।
আশিক : আমি আশিক। অনুমতি ছাড়া কী করে ঘরে ঢুকব।
মধুবালা : এটা কী তোর স্কুলের ক্লাসরুম পেয়েছিস নাকি। তাড়াতাড়ি আয়, কাজ সেরে কেটে পড়, আমার আরও নতুন খদ্দের ধরতে হবে।
দরজাটা খুলে আশিক দেখল অসম্ভব সুন্দর একটা ত্রিশ বছরী মহিলা, পান চিবাচ্ছে আর হাতে জলন্ত সিগারেট নিয়ে শুধু অন্তর্বাস পরে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আশিককে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল;
মধুবালা : কী রে তোকে দেখে তো ভদ্র ঘরের ছেলে মনে হচ্ছে, তা গার্লফ্রেন্ড বাদ আমায় কেন করতে এসেছিস?
আশিক : আমি কী বিছানায় বসতে পারি?
মধুবালা : শোন বেশি ভদ্র সাজতে যাবি না, তাহলে কিন্তু মুখ দিয়ে খুব খিস্তি বার হবে। আমার দিমাক খাস না বললাম, তাড়াতাড়ি করে এখান থেকে ফোট।
আশিক : আপনি আমাকে গালাগালি করবেন কেন, আমি কি আপনাকে খারাপ কিছু বলেছি?
মধুবালা : শোন এখানে যারা আসে সবাই ফূর্তি করতে আসে, তোর ভালো করে গোঁফদাড়ি গজায়নি অথচ তুই চাহিদা মেটাতে চলে এসেছিস। গার্লফ্রেন্ড মনে হয় দেয়নি। তাড়াতাড়ি জামা-প্যান্ট খোল, দু'ঘন্টা পার হয়ে গেলে তোর টাইম শেষ, তখন কিন্তু অন্য খদ্দের চলে আসবে। আমার চাহিদা তো দেখলি, সবচেয়ে হাইরেটের মাল, সব জিনিস দেখছিস না, জিভে জল ঝরবে, তাড়াতাড়ি আমার সাগরে ঝাপ দে, দেখ একদম তলিয়ে যাবি।
আশিক : আমি আপনাকে আপনি করে বলছি দেখেছেন। আমি আসলে একজন ছোটখাটো লেখক। লেখায় বিভিন্ন মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরি।
মধুবালা : তাহলে এখানে কী চুদাতে এসেছিস। এখানে সবাই হাসিখুশি থাকি, গতর বেঁচি আর পয়সা পেয়ে খুব আনন্দে থাকি। দিনে কতজন পুরুষের বিছানায় শুই তার ঠিকঠিকানা নেই।
আশিক : না মানে, আমি আপনার কাছে এক সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি। আপনি যদি আমাকে আপনার কথা খুলে বলেন।
মধুবালা : শোন আমি সবকিছু খুলে দেখানোর জন্য পয়সা নিই, খুলে বলার জন্য নয়। মাথা গরম করাস না বলে দিলাম, তাড়াতাড়ি করে বিদায় হ।
আশিক : আপনি এত সুন্দর একজন মানুষ, আপনারও নিশ্চয়ই পরিবার ছিল, আপনি তো নিশ্চয়ই স্বেচ্ছায় এই পথে আসেননি?
কথাটা মধুবালার একদম হৃদয়ে আঘাত হানল, নিমিষেই দু-চোখ জলে ভরে গেল। বিছানার পাশে রাখা প্যান্ট-শার্ট পরে আশিককে বিছায় বসতে বলল।
আশিক : দিদি প্লিজ আমাকে আপনার জীবনের কাহিনী একটু শেয়ার করুন।
মধুবালা : ( জলে ভরা চোখে ) এই দশ বছরের যৌন পল্লীর জীবনে প্রথমবার কেউ আমাকে খানকি না বলে দিদি বলে ডাক দিল। আমারও একটা সুন্দর পরিবার ছিল ভাই। তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন ছিলাম আমি। কত আদর করে আমার বাড়ির লোক নাম রাখে বৃষ্টি, অথচ এই নর্দমায় আমি মধুবালা নামে আজ নিজের মধু বিক্রি করি।
আশিক : দিদি, তারপর এত আদুরে বোন হওয়ায় সত্ত্বেও আপনি এমন নোংরা জগতে কীভাবে?
মধুবালা : আমি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম। স্কুল জীবনে আমি এক ছেলেকে ভালোবাসি। বয়সে সে আমার থেকে অনেকটাই বড় ছিল। ভালোবাসার নাটক করে আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে অনেকদূর পালিয়ে আসে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়৷
আশিক : তারপর কী হয়....?
মধুবালা : তারপর আর কী....! অভাগীর কপালে যা ছিল তাই হল, জীবনের একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আমাকে এক দালালের মারফত এই অন্ধকার জগতে বিক্রি করে দিল।
আশিক : বাড়ির জন্য খারাপ লাগে না আপনার?
মধুবালা : খুব খারাপ লাগে রে ভাই। যখন আমাকে ড্রাগ খাইয়ে এখানে নিয়ে আসে আমার দু'দিন হুঁশ ছিল না। জ্ঞান ফিরলে দেখি আমি এখানে। প্রথমবার যখন এক নেতার ঘরে পাঠায়, আমার সতীত্ব নষ্ট করা হলে আমি ভীষণ কান্না করি। বাবাগো মাগো বলে এই চার দেওয়ালের মধ্যেই আমার মিথ্যা প্রেমের দাফন হয়, আর আমি এক কলঙ্কিত বেঁশ্যার উপাধি পায়।
আশিক : বাড়ির লোকের কোনো সন্ধান হয়নি আর?
মধুবালা : এই অন্ধকার জগতে এসে আমি আর কারো সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি। নিজের বাকিটা জীবন ভাগ্যের কাছে ছেড়ে দিয়েছি, যতদিন চামড়া শক্ত আছে দেহ বেঁচে যাব, তারপর যখন চামড়া ঝুলে যাবে কোনো নর্দমায় পড়ে থেকে শিয়ালে-কুকুরের কাছে দেহ বিলিয়ে দেব।
আশিক : কখনো আর ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হয় না?
মধুবালা : বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। ছোটভাইটা আমাকে ছাড়া রাতে ঘুমাত না, ওর জন্য আজও মনটা খুব আনচান করে। জানি না ওরা সবাই কেমন আছে!
আশিক : এখান থেকে বার হওয়ার কোনো উপায় নেই?
মধুবালা : এখান থেকে বার হওয়ার কোনো উপায় নেই, তবে কেউ যদি অনেক টাকা দিয়ে আমাকে কিনে নেয় তবে এরা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দেবে।
আশিক : কত টাকার বিনিময়ে বিক্রি করবে আন্দাজ?
মধুবালা : সঠিক হিসাব বলতে পারবো না, তবে আট-দশ লাখ টাকা হলে দিতে পারে। তুই কেন এসব শুনছিস?
আশিক : ( কাছে সরে এসে হাতটা শক্ত করে ধরে বলল ) দিদি আমি আবার আসব তোমার কাছে, তবে এবার খালি হাতে নয়, দশ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে তারপর আসব।
পাম্মি বাইরে থেকে আওয়াজ দিল আর কত সময় ধরে করবি, বেটার দম আছে মানতে হবে। তাড়াতাড়ি আই নতুন খদ্দের এসেছে, তাকেও তো সুযোগ দিতে হবে নাকি?
আশিক বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হল, দেখল মধুবালার চোখ ভর্তি জল চিবুক ছুঁয়ে বিছানায় টপটপ করে পড়ছে। আশিক তার বন্ধু, পরিচিত বা রক্তের কেউ নয় তবে অন্ধকার জীবনে এসে এই প্রথমবার তার শরীর ছুঁয়ে নয় বরং মনটা ছুঁয়ে দেখল সে।
কোনো এক অলিখিত চুক্তিপত্র সই করে আবার ফিরে আসার শিলমোহর দিল, মধুবালা অশ্রুসিক্ত নয়নে বুঝি অদূরে মুক্তির আলো দেখতে পেল। আবার ফিরে আসার দৃঢ় প্রত্যয়ে আশিক বেরিয়ে গেল...
নতুন করে বাঁচার ক্ষীণ আশায় মধুবালা চাতক পাখির মত চেয়ে রইল....!
 |
| সালাম মালিতা |