![]() |
| সালাম মালিতা |
সেদিন আকাশটা ঘনকালো মেঘে ঢেকে ছিল, মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই কালবৈশাখীর উদয় হয়ে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিপাত হবে৷ তমাল গুটিকতক পোশাক ব্যাগে ভরে আরশিয়াকে বিদায় দিতে এল। চোখ ভর্তি জল আর বুকে অদম্য সাহস নিয়ে আশার প্রদীপ জ্বেলে চলে গেল....দূর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। দিন, তারিখ, মাস, বছর বা সালকে প্রতীক্ষার ক্যালেণ্ডারে যুক্ত করে ঝুকঝুক করে ছুটে চলা ট্রেনে পাড়ি দিল। বাহ্যিক অবয়ব সাথে গেলেও ভালোবাসার চিরকুট আরশিয়াকে ছিঁড়ে দিল, আর শূন্য প্রেমকক্ষ নিয়ে অচীন পথে আবার ফিরে আসার অভঙ্গুর পণে বাস্তবতার কুহেলিকার অতলে হারিয়ে গেল।
তমাল যাওয়ার আগে আরশিয়ার পছন্দের শিউলি চারাটি মাটির ঘরের দক্ষিণ দিকের বাতায়নের পাশে রোপণ করে। বছরের পর বছর ফুলের সুবাস দিতে দিতে গাছটিও আজ ক্লান্ত। নিজের সকল পাতা ঝরিয়ে মাঝে মাঝে গভীর নিশীথে অস্ফুট বাক্যে বলে ওঠে - " ফুল দিতে দিতে আমি আজ বৃদ্ধ হয়ে গেছি, আমাকে একটু মুক্তি দেওয়া হোক। আমি আজ অবসরে যেতে চায়! " গত দু'বছর হল গাছটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, শুধুমাত্র পাড়াগাঁয়ের খড়ি কুড়ানোর বধূর দৃষ্টিপাত হয়নি বিধায় অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া বাকি। কাঁচাপাকা চুলে আরশিয়া উলের সোয়েটার বুনতে বুনতে অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেও তমালের ভালোবাসার দুর্মূল্য অস্তিত্ব আজ নিশ্চিহ্নের পথে৷ অলিখিত চুক্তিপত্রের জবাবদিহিতা আরশিয়াকে অশনি সংকেতের দুর্গন্ধ কক্ষে কোণঠাসা করতে থাকে৷খড়ের চালে রাখা টিয়াপাখির খাঁচাটি আজ ভগ্নপ্রায়৷ তমালের যাওয়ার কয়েক বছর পর পাখিটির মনঃকষ্টে অক্কা পাওয়ার উপক্রম হয়৷ নিজের জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়ে দু'জনের মেলানোর মহৎ উদ্যোগে, আরশিয়া খাঁচার আগল উন্মুক্ত করে দেয়, তারা জীবিত থাকলে হয়ত বড় পরিবার গঠন করে ফেলেছে। বাড়ির পাশের উত্তাল নদীটা আজ সংকীর্ণ, সভ্যতার করাল গ্রাসে দমবন্ধ হওয়ায় কোনোরকমে অন্তিম প্রহর গুনছে। ধূলোময়লা আঁকাবাঁকা মেঠোপথে আজ কংক্রিটের ঢালাই। ঘরের পিছনে থরে থরে পড়ে আছে গত হওয়া বছরের একাধিক ক্যালেণ্ডার। পুষ্টিহীনতায় আরশিয়া চোখে কম দেখতে পায়, চশমার সাহায্যে মানুষ চিনতে হয়। মুখের কিছু দাঁত ইতিমধ্যে সঙ্গ দিতে বিরোধ করে নিজে থেকে পড়ে গেছে। অপেক্ষার অনন্ত প্রহর গুণে চোখের জল শুকিয়ে একদম খটখটে হয়ে গেছে...!সেবছর গাছে প্রচুর মকুল এসেছিল। প্রতিটি শাখায় শাখায় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা একদম থোকায় থোকায় ধরেছিল। সরকারি আধিকারিক হাঠাৎ গাঁয়ের পথে মাইকে ঘোষণা ঘরে, আগামী তিনদিন পর বিশাল ঝড় আসছে, তাই যার যা কিছু আছে সেগুলো নিয়ে যেন সুরক্ষিত জায়গায় পৌঁছায়। আরশিয়ার হারানোর মত অবশিষ্ট তেমন কিছুই ছিল। সম্পদ বলতে মাটির কিছু হাঁড়ি-পাতিল, পুরানো পোশাক আর কয়েকটা আধুলি। তল্পিতল্পা গুছিয়ে বড় রাস্তার পাশে আর কয়েকজনের সাথে অবস্থান নিল। শুনল হাতে মাত্র দু'দিন বাকি।পরেরদিন ঘুম ভেঙে আরশিয়া দেখল রাস্তার তেমাথায় বেশ ভিড় হয়েছে, বড় চুলদাড়ি নিয়ে একটা পাগল কাকে যেন খুঁজে চলেছে। নিজের ষাট বসন্তের জমা সুপ্ত আশা আজ এক লহমায় জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মত জেগে উঠে...বিষাদের ভূমিকে ছয়লাপ করে দিল। লোকের ভীড় সরিয়ে চশমা ছাড়াই আরশিয়া দেখল সেই চল্লিশ বসন্ত আগের, তাকে কথা দেওয়া মানুষটি পাগলের মত দ্বারেদ্বারে ঘুরে আবার তার কাছে ফিরে এসেছে। এক দৌড়ে কাছে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে বলল - " তমাল দেখ আমি তোমার আরশু, জানো আজও তোমার জন্য আকাশের তারা গুনি, হারিকেনের আলোয় তোমার ছবির সাথে গল্প করি। তোমাকেই সাতজনমের সঙ্গী মেনেছি তাই অন্য কারো সাথে আর ঘর বাঁধিনি। "





