 |
| মুন্নাফ সেখ |
এখন তো সব মুঠোফোনে বন্দি আবেগটুকু,
স্মৃতিরা সব ধুলো জমা এক পুরোনো সিন্দুক।
নদীপথের সেই যাত্রা দিয়ে শুরুর স্মৃতিগুলো,
যখন বাহন ছিল না কোনো, উড়ত না পথের ধুলো।
মায়ের সাথে লঞ্চে চড়ে নদীপথে দূরে যাওয়া,
নানীমার সেই আদুরে আঁচল, স্নিগ্ধ সুশীতল হাওয়া।
তখন ছিল জলপথের রাজত্ব আর ইঞ্জিনের ধুকপুক,
লঞ্চের শব্দে ডানা মেলত ছোট্ট মনের সুখ।
নদীতে সপরিবারে স্নান আর মায়েদের কাপড় কাচা,
সেই ভিজে কাপড় বয়ে নিয়ে আসার নির্মল আনন্দ বাঁচা।
মায়েদের সাথে কলাইয়ের ডাল ধুতে যাওয়ার সেই বেলা,
চিনির সাথে কাঁচা ডাল— সে যে অমৃতের মেলা।
সকালবেলা উঠোনের রোদে বড়ি দেওয়ার সেই ধুম,
পিটুলি বা নিম ডাল দিয়ে দাঁতন, ভাঙলে চোখের ঘুম।
তখন ছিল না টুথব্রাশ, ছিল না যান্ত্রিক কোনো টান,
প্রকৃতির কোলেই বেড়ে উঠত শৈশবের জয়গান।
মামার বাড়ির সেই দড়ির খাট, তালপাতার মিষ্টি হাওয়া,
দিদিদের সেই হারিকেন মোছা, পরম সুখে দিন পাওয়া।
মামার বাড়ি থেকে ফেরার বেলা কান্না আসত মনে,
নদীর ধার দিয়ে পালিয়ে যেতাম বিকেলের সেই ক্ষণে।
মামা আসতেন পিছু পিছু ছুটে, ধরার ব্যাকুলতা,
ছুটতে ছুটতে বাড়ির কাছে পৌঁছানোর সেই কথা।
নদীর পাড় আর সেই লুকোচুরি, মামার শাসন-স্নেহ,
এমন সোনার শৈশব কি আর ফিরে পাবে আজ কেহ?
মাটির উপরে দাগ কেটে সেই ষোল গুটি খেলা,
বত্রিশ গুটি আর এক বাগ মিলে কাটত সারাবেলা।
স্কুলের পথে কাঁটা খয়রা ফল, টক-মিষ্টির স্বাদ,
পরের বাগানে পেয়ারা চুরিতে ছিল না কোনো বিবাদ।
গভীর রাতে খেজুরের রস বন্ধুদের সাথে খাওয়া,
বাবার অগোচরে নারকেল পাড়া— এক অদ্ভুত পাওয়া।
রোজার মাসে রোজা না রেখেও বন্ধুদের সাথে মেলা,
মামার বাড়িতে ভোজ চলতো— এক অনন্য লুকোচুরি খেলা।
পান্তা ভাত আর আলুর চটকা, ভেজা ভাতের সেই ঘ্রাণ,
বিয়ের বাড়িতে দিদিরা সব হাসত দেখে আমার কাণ্ডজ্ঞান—
"গরম ভাতের দরকার নেই, দিও ওকে ভেজা ভাত মেখে!"
সেই ঠাট্টায় মায়া ছিল কত, স্মৃতির পাতায় থাকে।
ক্লাস নাইনে অনেক পরে প্রথম এলো সেই সাইকেল,
জীবনের মোড় যেন ঘুরে গেল, শুরু হলো অন্য লেভেল।
অবিরাম পথে বন্ধুদের নিয়ে সেই সাইকেলে ছোটা,
হৃদয় জুড়ে হাসি-আনন্দের স্বপ্নগুলো গাঁথা।
স্কুলেতে গিয়ে বন্ধুদের তরে বেঞ্চটা রাখা ধরে,
চিঠি লিখে আজ মন হালকা করার দিন গেছে কবে মরে!
চায়ের দোকানে সিডি-ভিসিডি, ভিড় করে দেখা ছবি,
ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নামা মোরা, হতে চেয়েছি কি সবি?
কোথায় হারালো সেই সব হাসি, মেঠো পথের সেই ধুলো?
বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নেওয়া আনন্দ-উচ্ছ্বলগুলো।
এখন তো শুধু স্ক্রিনের আলোয় কাটে সবার দিন,
শৈশব আজ ঘরবন্দি, চার দেওয়ালে বিলীন।
মাটির গন্ধ পাওয়া যায় না তো, সবখানে কংক্রিট,
মনটা আজও খুঁজে ফেরে সেই পুরোনো দিনের গীত।
হেঁটে চলি আজ একাকী পথে, যন্ত্রের এই ভীড়ে,
ইচ্ছে করে আবার একবার সেই শৈশবে যাই ফিরে।
উড়ন্ত সেই দিনগুলো আজ হৃদয়ে দেয় যে নাড়া,
স্মৃতিরা কেবল জীবন্ত রয়, আমরাই বাঁধনহারা।
ফিরে কি আসবে হারানো রোদ্দুর, সেই সে সোনালী দিন?
শৈশব আজ শুধুই গল্প, এক অবাস্তব রঙিন স্বপ্ন বিলীন।