বধির হয়ে গেলো উমা। কী অপরাধ ছিল উমার! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে। কারো কোনো কথায় সাড়া দেয় না। ঘুম নেই, খাওয়া নেই, দিনরাত যেন এক হয়ে আছে। পাড়ার মানুষ কানাঘুষা করে বলে, মেয়েটা মনে হয় পাগল হয়ে গেলো। সুন্দর জীবনটা একদম শেষ করে দিলো লম্পট বরটা।
উপলকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো উমা। উপলের ভালো মানুষের অন্তরালে যে, এত নিষ্ঠুর মন, এত খারাপ! মুখোশ পরা একজন মানুষ। উমার ভালোবাসায় কোনো খামতি ছিল না। হৃদয় উজাড় করে ভালোবেসেছিল। দিনের পর দিন উপল উমাকে ঠকিয়েছে। উমা মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। রূপে গুনে অনন্যা উমা। বাবার ও ছিলো অঢেল সম্পত্তি। সম্পত্তির লোভে উপল উমাকে ভালোবাসার মিথ্যে নাটকে ফাঁসিয়েছে।
উমা সহজ সরল মেয়ে। উমার বাবা মারা যাওয়ার পরে উপলের কুৎসিত মুখ আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। যখন প্রথম সন্তান সম্ভবা হলো, তখন উপল নানা অজুহাতে সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ দিতে থাকে উমাকে। এতে উমা খুব কষ্ট পায়। অনেক অনুনয় বিনয় করেও এ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত করতে পারলো না উপলকে। নার্সিংহোমে যেদিন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উমার মাতৃ জঠর থেকে তার বুকের ধন বের করে নিচ্ছে ডাক্তার, উপল তখন হাসিতে মত্ত বাইরে দাঁড়িয়ে।
এক একটি খোঁচায় যেন প্রাণ বেরিয়ে আস্তে চায় উমার। দুচোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে ডাক্তার বলে, আপনি নিজে থেকে কী এবরশন করতে চান না?তাহলে কেন করছেন এই নিষ্পাপ জীবনটাকে হত্যা? কিছু বলে না উমা চুপ থাকে। ডাক্তার যখন পরিষ্কার করা ঐ জিনিসটা দেখায় উমাকে, ধক্ করে উঠে উমার বুক। যেন হৃদপিণ্ডটা এক মুহুর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল! উপল আসলো উমার কাছে। একটু হেসে উমাকে বলে, ভেবো না এসব কিছু না। সব ঠিক হয়ে যাবে। উপলের এই নির্মমতা দেখে উমা আরো কষ্ট পেলো। পেটে একটু হাত বুলিয়ে দেখে উমা। না আর নেই আমার অস্তিত্বের মধ্যে বেড়ে উঠা জীবনটা, শেষ হয়ে গেলো।
এর কিছু দিন পর উপল উমাকে বলে, উমার বাবার সম্পত্তি উপলের নামে লিখে দিতে। স্তব্ধ হয়ে গেল উমা। কি বলছে এসব উপল! ভালোবাসার কাছে হার মানে উমা। বাবার সম্পত্তি লিখে দিলো উপলের নামে। কী সর্বনাশ করলো উমা তখনো জানেনা। হঠাৎ একদিন উপল বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর বাড়ি ফিরলো না। কোনো খবরও দিলো না। ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন বলছে বার বার। ভেঙ্গে পড়ে উমা। দিন যায়, মাস যায় উপলের খোঁজ আর পেলো না উমা। কি করবে বুঝতে না পেরে লোকাল থানায় জানায় উপলের কথা। থানায় একটা হারানো ডায়েরি করে। উপলের ছবি দিয়ে আসে।
রাত প্রায় দশটা বাজে লোকাল থানা থেকে ফোন আসে উমার কাছে। উমা খুশিতে থানায় যায়। থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে একি শুনলো উমা! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পরেরদিন সকালে খবরের কাগজে বড় বড় করে উপরের পাতায় লেখা, প্রতারক রোমেল পুলিশের কাছে ধরা পড়েছে।
বিভিন্ন নামে মেয়েদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাদের সম্পত্তি নিজের নামে করে তারপর চম্পট দেয়। ছদ্মনামে উপল হয়ে শহরের কোটিপতির মেয়ে উমাকে বিয়ে করে তার সম্পত্তি নিজের করে নিয়ে আত্মসাৎ করার চেষ্টা। এই খবর চোখে পড়তেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে উমা। সেই থেকে আজ অবধি উমা নিষ্প্রাণ অপলক হয়ে কঙ্কালসার হয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছে। না জেনে না বুঝে, যে সর্বনাশ উমা করলো, তার তীব্র যন্ত্রনার দায় বয়ে বেড়াচ্ছে আজও। এ
ই সমাজের আশেপাশে এমন অসংখ্য উপল ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভালো মানুষের মুখোশের অন্তরালে থাকে এক কুৎসিত মুখ।
![]() |
| সুবর্ণা দাশ |







