বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি - (পর্ব– ২)



 গল্পধারা বুধবার 🔰

বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত - 
সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন 

সম্পাদক - আকাশ আহমেদ

প্রকাশঃ  ই মে ২০২৬ (বুধবার)

প্রচ্ছদ ডিজাইনঃ সর্বানী দাশ



------------------------------------------------------------------------------------


 
ধারাবাহিক গল্প: 

অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি

লেখিকা: সাদিয়া চৌধুরী রুনা 

পর্ব – 
(স্মৃতির সিন্দুক ও একটি অসম্পূর্ণ ডায়েরি)

বাইরে বৃষ্টির বেগ বাড়ছে - 

শমসের সাহেব অরণির সাথে একটা পুরনো ট্যাক্সিতে করে শহরের শেষ সীমানার দিকে যাচ্ছেন। ট্যাক্সির কাঁচের ওপাশে ঝাপসা হয়ে আসা রাস্তার আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে শমসের সাহেবের মনে হচ্ছিল, তিনি যেন বর্তমান থেকে পঁচিশ বছর আগের কোনো এক অতীতে ফিরে যাচ্ছেন। অরণি চুপচাপ বসে আছে। তার হাতের আঙুলগুলো নীলুফার মতোই লম্বা আর সরু।

ট্যাক্সিটা এসে থামল একটা জীর্ণ দোতলা বাড়ির সামনে। 

বাড়ির চারপাশটা ঝোপঝাড়ে ঘেরা, আর গেটের ওপর লতাগুল্মের এক অদ্ভুত রাজত্ব। ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের সেঁতসেঁতে সোঁদা গন্ধ নাকে এলো। অরণি ড্রয়িং রুমের কোণ থেকে একটা পুরনো ট্রাঙ্ক বের করে আনল। ধুলো আর মাকড়সার জালে ঘেরা সেই ট্রাঙ্কটির ঠিক মাঝখানে একটা পিতলের তালা।

অরণি বলল -

- "শমসের জেঠু, এই সেই সিন্দুক। মা মারা যাওয়ার কয়েক দিন আগে আমাকে বলেছিলেন, এই তালার চাবিটা আপনার কাছে আছে। 

- মা বলেছিলেন— 'এই সিন্দুকটা খোলার অধিকার শুধু তাঁরই আছে, যিনি আমার সব নীরবতাকে ভাষা দিতে পারতেন'।"

শমসের সাহেব পকেট থেকে সেই মরচে ধরা চাবিটা বের করলেন। চাবিটা ঘুরাতেই একঘেয়ে এক শব্দ করে তালাটা খুলে গেল। সিন্দুকটা খুলতেই শমসের সাহেব যা দেখলেন, তাতে তার দীর্ঘদিনের জমানো ধৈর্য বাঁধ মানল না।

ভেতরে কোনো হিরে-জহরত নেই। 
আছে শুধু শত শত চিঠির খাম। নীল, সাদা আর হলদেটে রঙের চিঠির স্তূপ। 
প্রতিটি খামের ওপর লেখা— 

*'শমসেরের জন্য'*। 

শমসের সাহেব একটি নীল রঙের খাম তুলে নিলেন। চিঠির তারিখটা আজকের থেকে ঠিক কুড়ি বছর আগের।

নীলুফা লিখেছে - 

"আজ আকাশটা মেঘলা, শমসের। তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। আমি জানি তুমি ভাবছো আমি তোমাকে ঠকিয়েছি। আমি হঠাৎ কেন উধাও হলাম, সেই কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ আমার বাবা আমাকে দেননি। যে রাতে আমরা পালানোর কথা ভেবেছিলাম, তার আগের রাতেই আমাকে একটা বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। তারপর জোর করে বিয়ে দিয়ে পাঠানো হলো এই সুদূর শহরে। আমার অপরাধ ছিল আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, আর তোমার অপরাধ ছিল তুমি একজন সামান্য ডাকপিয়ন। সমাজ আর আভিজাত্যের লড়াইয়ে আমার ভালোবাসাটা হেরে গেল, শমসের।"

চিঠিটা পড়তে পড়তে শমসের সাহেবের চোখের জল চিঠির কাগজের ওপর টপটপ করে পড়তে লাগল। তিনি জানতেন না, পঁচিশ বছর ধরে তিনি যে নীলুফাকে ঘৃণা করে এসেছেন, সেই নীলুফা প্রতিদিন তার সাথে মনে মনে কথা বলেছে।

সিন্দুকের ভেতর আরও একটা জিনিস ছিল—একটি ছোট ডায়েরি। ডায়েরিটা খুলতেই শমসের সাহেব দেখলেন, সেখানে নীলুফা প্রতিদিনের রুটিন লিখে রাখত। ডায়েরির পাতায় পাতায় বকুল ফুলের শুকনো পাপড়ি লেপ্টে আছে। ডায়েরির শেষ পাতায় নীলুফা লিখেছে -

"শমসের, 
আমি জানি এই চিঠিগুলো কোনোদিন ডাকবক্সে জমা হবে না। আমি জানি তুমি কোনোদিন এগুলো বিলি করতে আসবে না। কিন্তু আমি তো ডাকপিয়নের প্রেমিকা। আমি বিশ্বাস করি, একদিন ঠিক কোনো এক অলৌকিক উপায়ে এই কথাগুলো তোমার কাছে পৌঁছাবে। আমার চাবিটা তোমার কাছেই আছে। চাবিটা দিয়ে তুমি শুধু এই সিন্দুক নয়, আমার জীবনের সেই অন্ধকার ঘরটাকেও মুক্ত করে দিও।"

অরণি শমসের সাহেবের কাঁধে হাত রাখল -
- "জেঠু, মা আপনাকে কোনোদিন ভুলতে পারেননি। বাবার সাথে মার কোনোদিনও বনিবনা হয়নি। মা শুধু আপনার চিঠির প্রতীক্ষায় জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।"

শমসের সাহেব সিন্দুকটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ভাবলেন, পঁচিশ বছর ধরে তিনি কত শত মানুষের চিঠি বিলি করেছেন, কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান চিঠিগুলো তার সামনেই ছিল, অথচ তিনি তা জানতে পারেননি।

হঠাৎ অরণি বলল -
"জেঠু, এই সিন্দুকের নিচে একটা গোপন কম্পার্টমেন্ট আছে। সেখানে আরও একটা জিনিস আছে যা দেখে আপনি চমকে যাবেন। ওটা মা আপনার জন্যই বিশেষভাবে বানিয়েছিলেন।"

শমসের সাহেব সিন্দুকের তলানিটা সরাতেই এক অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেলেন। সেটা ছিল একটা হাতে তৈরি কাঠের নকশা। 

কিন্তু সেটা কীসের নকশা ? 

শমসের সাহেবের মনে হলো, এই নকশাটা যেন একটা মানচিত্র। 

কিন্তু কোথায় যাওয়ার মানচিত্র ?


-------------------------------------------------------------------



লেখিকা: সাদিয়া চৌধুরী রুনা 

সাদিয়া চৌধুরী রুনা (পিতা: আবদুস সোবহান) একজন স্বপ্নবাজ লেখিকা। পড়াশোনা করেছেন নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে। ফেসবুকের পরিচিত মুখ সাদিয়া নিয়মিত লেখালেখি করছেন এবং তাঁর কবিতা ইতিপূর্বেই বেশ কিছু যৌথ কাব্যগ্রন্থে স্থান করে নিয়েছে।

দুঃস্বপ্ন... - রাজ কিশোর দাস

 


দুঃস্বপ্ন 
- রাজ কিশোর দাস


জানি না, তুই আমার দুঃস্বপ্ন -
নাকি আমার গন্তব্য।

বুঝিনি কোনোদিন
তোর আমার প্রতি যত্ন।

আমি আর কি আমিই আছি?
নাকি হয়ে গেছি
অন্য একটা কেউ।

আর কি তুই নিবি
আমার খোঁজ?

এখন আর
রাত দশটায়
কেউ খোঁজ নেয় না!

আমি সেই বোকা,
বসে আছি
অচেনা বারান্দায়।

সব সত্যিই কি ঠিক হয়?
নাকি
আমার বেলায় অন্য কিছু?

এখন তুই কি আর
আমার কথা ভাবিস?

আর কি তুই নিবি
আমার খোঁজ?

মনে হাজার হাজার প্রশ্ন,
কিন্তু জানি না—
তুই কি আমার দুঃস্বপ্ন 
নাকি গন্তব্য?


লেখক - রাজ কিশোর দাস


কাচের চুড়ি - ড. তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়




 কাচের চুড়ি
- ড. তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়


রঙ বাহারি কাচের চুড়ি
হাতে বেশ তো মানায় ,
আগে কেন কিনে দিই নি
আসে নি কেন মাথায়  ?

বয়স একটু বেড়েছে না হয়
তাও তো লাগে ভালো  ,
তুমিও তো আগে বলো নি
কেবল সোনায় নজর ছিল  !

সোনার যা দাম দেখি
আর ক'জন ই বা পরবে  ?
বছর পঞ্চাশ পরে হয়তো
 ধনীদের বাড়িতেই থাকবে ।

আমাদের মতো সাধারণের
কাচের চুড়ি ই ভালো ,
বিধাতা যারে সুন্দর গড়ে
কাচের চুড়িতে ই  চোখ আলো   !

হাত যেন না কাটে
একটু নজর রেখো ,
সাবধানে করবে কাজ
ধৈর্য্য সহকারে দেখো  ।

সোনার হাতে কাচের চুড়ি
ঝলমল যেন করে  ,
কেন যে চোখ নজর দেয় নি
ছোট সব দোকান ঘরে  !

সুখ শান্তি  সব ই আসে
ছোট ছোট প্রাপ্তির মাঝে ,
তুমি শুধু হৃদয়ে থেকো
সকাল দুপুর  সাঁঝে   ।



লেখক - ড. তুষার কান্তি মুখোপাধ্যায়


হয়নি পূরণ... - দেবাশীষ হালদার

 
লেখক - দেবাশীষ হালদার


হয়নি পূরণ
- দেবাশীষ হালদার


বালক থেকে কবিতার লেখায় লেখায় আগুনে ঝলসিয়ে সমাজটাকে,
 অর্জন করলে উপাধি বিদ্রোহী বালক কবি।
শ্রেণী বিভক্ত সমাজে তোমার লেখনি শানিত তরবারি ।

"খুদার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, 
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি " 
বালক হয়েও অভিজ্ঞ মতামত ।
আবার কখনো লিখেছো " প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল, 
এ পৃথিবী সব  শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি "

সমাজের বুকে এঁকে পদচিহ্ন, 
গালেতে ইস্পাত কঠিন হাতের থাপ্পড়ে -
কেঁপে উঠেছিল সারা দুনিয়ার পীড়কেরা।
তোমার এক একটা কবিতা উলঙ্গ করে দেখিয়েছিল -
সমাজের হাড় জিরেজিরে চেহারাকে ।

তোমার লেখার বলা কথায় 
সমাজ হচ্ছিলো সঙ্ঘবদ্ধ সামাজিক ন্যায়ের আন্দোলনে ।
অসুস্থ অভুক্ত কবি নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াসে রেখেছিলে 
কঠিন কঠোর মানসিকতা অত্যাচারীর  বিরুদ্ধে ।

তুমি যে শিশুদের জনৃ সুরক্ষিত বাসযোগ্য বাসভূমি চেয়েছিলে,
আজ এই অভাগা পৃথিবী তোমার দেখা পৃথিবীর চেয়েও ভয়ঙ্কর।

হে  যুগ সন্ধিক্ষণের বিদ্রোহী বালক কবি, 
তুমি আরো একবার ফিরে এসো,
ফিরো এসো সেই সর্বহারাদের মাঝখানে - 
তোমার ইস্পাত কঠিন লেখনি নিয়ে।

ভাঙতেই হবে - 
জাত, ধর্ম আর মিথ্যের বেসাতি করা কুচক্রীদের মিলিত দর্প।
এসো ফিরে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য অন্য কোন নামে
তোমাকে চিনে নেবো তোমার লেখনিতে ।

মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

অতীতের পোড়া গন্ধ... - মেফ্তাহুল জান্নাত

লেখিকা - মেফ্তাহুল জান্নাত


অতীতের পোড়া গন্ধ 
- মেফ্তাহুল জান্নাত 

এক দুর্বিষহ নগরীর গল্প লিখেছেন বিধাতা,
অথচ, তাকেই কীনা ভাবতে চাই আপন,
মন তখনই মুখ ফিরিয়ে নেয়, ছটফট করে। 
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে।
তার বক্রদৃষ্টি আমি সইতে পারিনা।
মনখানা তার মুখ ফেরালেই,
আমার বর্তমান, আমার অতীত—
বিধাতাকে ভাবতে থাক পর; ক্রমে—-ক্রমে! 
ওরা হাতড়ে খোঁজে মর্মান্তিক অভিসম্পাতের ব্যাখ্যা!
কোনটা ভুল? কোনটা ঠিক?
এ নিয়েই তুমুল বিরোধ চলে রক্তে-রন্ধ্রে। 
অতীত আজকাল ফিরে ফিরে আসে দুঃস্বপ্নের মতো।
পুরোনো কবর থেকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সে—
অতৃপ্ত লাশ যেন!
অশরীরীর আক্রমণের মতোই;
রাতবিরেতে তার ক্রন্দন শোনা যায়।
পোড়া গন্ধ ভেসে আসে দূর থেকে। ঘুম হারায়। 
তারই ভয়াল দৃষ্টিতেই
ঘটে যেতে থাকে আমার ধ্বংসযজ্ঞ। 
ঘোরাফেরা করতে থাকে চারপাশে,
পোড়া দগ্ধ অতীত!
ভয়ানক সকল দৃশ্য! 
আমি—মুখ ফিরিয়ে নিই পরক্ষণে। ভাবতে থাকি।
পোড়া গন্ধ আসতে থাকে মস্তিষ্কের নাসরন্ধ্রে।
তবুও, সাঙ্গ হয় না বিধাতার লীলা। দাবার মার।
কী যে সেই পোড়া ভয়ানক অতীতের তীব্রতা….
কী যে তার সারমর্ম, তার অট্টহাসি!
কী যে….

বিধাতা শুধু আড়ালেই মুখ টিপে হাসে।
আর— বিভৎস দানবের মতো সেসব
অতৃপ্ত প্রেতাত্মার মতো অতীত—
খুবলে খেতে আসে বর্তমানের অস্থিমজ্জা।।

চিরন্তন পল্লীর ছবি.... - রামকৃষ্ণ পাল


চিরন্তন পল্লীর ছবি
- রামকৃষ্ণ পাল 


গ্রামের এই চিরন্তন ছবি 
সহজ সরল ধরন, 
সকাল থেকেই ছন্দে জীবন 
আজো করি স্মরণ।

পুব আকাশে রাঙিয়ে সূর্য 
কাঁধে লাঙ্গল কৃষকের,
চিরাচরিত চাষের কাজেই
নিত্য কাজটি আনন্দের।

রাখাল বালক চড়ায় মাঠে 
গরু ভেড়া বা ছাগল, 
সারাদিনটি কাটে বেশ সুন্দর 
মনকে বানায় পাগল।

সবুজ বাংলার পথটি ধরে 
চলছে জীবন নিরন্তর, 
সবুজ ধানে সোনার ফসল 
জ্বালানি ধোঁয়া প্রান্তর।

কেউ যাচ্ছে নদীতে ধরতে 
মাছ জালে ,বরশিতে,
প্রাণচঞ্চল গ্রামের এ জীবন 
সদাই হাস্য ধরিত্রীতে।


লেখক - রামকৃষ্ণ পাল 


অচেনা ঠিকানায় শেষ বিকেলের চিঠি - (পর্ব– ২)

  গল্পধারা বুধবার 🔰 বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ ই-বুক বিভাগ কতৃক প্রকাশিত -  সাপ্তাহিক ধারাবাহিক গল্পের সংকলন   সম্পাদক - আকাশ আহমেদ প্রকা...

জনপ্রিয় পোস্ট