বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

 

🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

সম্পাদকীয়

 অগ্নিফাগুন

বসন্ত মানেই শুধু ঋতুর পরিবর্তন নয় এক অন্তরের জাগরণ, রঙে-রসে ভেজা এক নতুন শুরুর আহ্বান পলাশ-শিমুলের আগুনরাঙা সৌন্দর্যে যেমন প্রকৃতি সেজে ওঠে, তেমনি মানুষের মনেও জেগে ওঠে সৃষ্টির উন্মাদনা, ভালোবাসার কোমলতা আর প্রতিবাদের দীপ্ত সাহস সেই অনুভবেরই শব্দরূপ আমাদের এই -বুক সংকলন- অগ্নিফাগুন

বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে প্রকাশিত এই সংকলনে আমরা একত্র করেছি নবীন প্রবীণ লেখকদের সৃজনশীলতা এখানে আছে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ অনুভূতির বহুমাত্রিক প্রকাশযেখানে কখনো রঙিন প্রেম, কখনো তীব্র প্রতিবাদ, আবার কখনো নিঃশব্দ আবেগ নিজের মতো করে কথা বলেছে প্রতিটি লেখা যেন বসন্তের এক একটি রঙমিলে তৈরি করেছে এক অনন্য বর্ণচ্ছটা

অগ্নিফাগুন শুধু একটি সংকলন নয়, এটি আমাদের সময়, সমাজ অনুভূতির এক প্রতিচ্ছবি এই বইয়ের প্রতিটি অক্ষরে আমরা খুঁজে পাই আমাদের চারপাশের গল্প, মানুষের না-বলা কথা, আর এক নতুন ভোরের প্রত্যাশা

এই পথচলায় যাঁরা তাঁদের মূল্যবান লেখা দিয়ে এই সংকলনকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের প্রতি জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা একইসাথে পাঠকদের প্রতিও আমাদের ভালোবাসা শুভেচ্ছা-আপনাদের পাঠই আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি

আশা করি, অগ্নিফাগুন আপনাদের হৃদয়ে একটুখানি উষ্ণতা, একটুখানি আলো এবং একরাশ অনুভূতির রঙ ছড়িয়ে দেবে 
 
শুভেচ্ছান্তে
আকাশ আহমেদ 
সম্পাদক
অগ্নিফাগুন


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸


📖 সূচিপত্র

        অগ্নিফাগুন


✍️ কবিতা

ভাইরাল বসন্ত  - বিমলশঙ্কর (ভৃগু)...... 
                                       এই পথ যদি না শেষ হয়  - প্রোজ্জ্বল রায় চৌধুরী....... 
পলাশ রাঙা বসন্ত - ড: পার্থ প্রতিম বিশ্বাস......
মন মাতানো মোহনায়  - মিজানুর রহমান.......
অন্য দোল  - অর্চনা নাগ মাইতি.......
বসন্ত  - অজয় চক্রবর্তী......
যাযাবর  - রকিবুল ইসলাম.......
অন্য দোল প্রোজ্জ্বল রায় চৌধুরী...... ১০ 
বসন্তের ছোঁয়া পরিবেশে  - আলমগীর হোসেন......১১ 
চাই না রক্তের হোলি  -  সর্বানী দাস........১৩
আনন্দ উৎসব  - মঞ্জুলা আচার্য্য.......১৪
আমি ভালো নেই  - শ্যামল কুমার মিশ্র.......১৫
কেন বসন্ত তুমি  - সমীরণ গোলদার........১৬
 বসন্ত  - শ্রীকান্ত ঘোষ.........১৭
আমার বসন্ত হারিয়ে গেছে  - সুমি সাহা........১৮
বসন্তপ্রিয়ার বনপলাশীর পদাবলী  - শ্রী সুজন.........১৯
বসন্তের কাছে আর্তি   - সোমনাথ সিকদার.......২১
শুভদৃষ্টি  - জয়নারায়ণ কোলে.......২২

          

📚 গল্প

বসন্তের সুর   - নিশিতা নাজনীন নীলা আল মাওয়াকিফ ........
                                            বসন্তের প্রথম প্রহরে  -  তামিম আদনান........১২
                                     রঙধনু বিকেলের স্বপ্ন  -  রকিবুল ইসলাম.........২০
                                                বসন্ত বাতাসে...  -  আকাশ আহমেদ.......২৪


🖋️ প্রবন্ধ

বসন্তের রঙে মানবতার উৎসব - তপন বৈদ্য..... 


💭 অনুভূতি

ফাগুনের চিঠি  - রতন দাস......২৩


🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

 (ক্রমিক নং- ০১)

ভাইরাল বসন্ত
কলমে - বিমলশঙ্কর (ভৃগু)

বসন্ত উৎসব
ক্যালেন্ডারের পাতা ধরে নেমে আসে পথে
রঙের খাজানা নিয়ে
ছুটে চলে সব উৎসবের নাওতা নিয়ে
বসন্ত মানেনা বয়েস
মানেনা ধর্ম বর্ণ বৈষম্যের ধার
সার্বজনীন বসন্ত উৎসব
নারী পুরুষ যুবক যুবতী কিশোর কিশোরী
মিলনের বাঁশি বাজায় বসন্তের সামীয়ানায়
পাড়ার কিলোপেট্রার মুখে আবির ছোঁয়াতে 
উৎসুক ভিক্ষুক থেকে সম্রাট
রঙের জলে ভিজে যাওয়া সপসপে নিটোল শরীর
ঘটে যায় কতো অঘটন নিঃশব্দে কোন ফাঁকা বাড়ির দোতলায়
মত্ত মাতঙ্গ লাম্পট্য বেশ ধরে
বসন্ত পুজারী যতো
ভালবাসার নামে দেগে দেয়
নিস্পাপ কলির পিঠে বসন্তের ছাপ
ভাইরাল বসন্তের ছবি ফেবু
ইন্টারনেট ইন্সটাগ্রামে
কতো বসন্ত আসে কতো বসন্ত যায়
আগামী বসন্তের অপেক্ষায়
বসন্তের বাতাসে বয়ে যায়
কারোর পৌষ মাস, কারোর সর্বনাশ ।
 

বিমলশঙ্কর দাস (ভৃগু)
ঠিকানা - ফুলিয়া টাউনশিপ, ফুলিয়া কলোনি, শান্তিপুর, নদীয়া, পিন - ৭৪১৪০২


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০২)

এই পথ যদি না শেষ হয়  
কলমে - প্রোজ্জ্বল রায় চৌধুরী
 
বুড়ো বুড়ি থাকে বৃদ্ধাশ্রমে দুই জনে দুই তলায়
পুং বিভাগে থাকে বুড়ো আর বুড়ি থাকে - মহিলায়।
ওদের পাঠালো বৃদ্ধাশ্রমে ওদেরই কন্যা সন্তান,
নিজেদের করা বাড়িতেই তাই হলোনা ওদের স্থান।
এক সাথে থাকে বৃদ্ধাশ্রমে তবু এক সাথে নয়
ছিন্ন শিকড়,ভিন্ন বিছানা, শুধু ভিড়ে মিশে রয়।
তবু বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ককিলে শিমুলে পলাশে
দোলোৎসব পালিত হবে ওই হোমের ক্যাম্পাসে।
দোলের দিনে সব বুড়ো বুড়ি মেখেছে সবে আবির
ঠিক তখনই বরের বাইকে মেয়ে এসে হলো হাজির।
বাপ মায়ের পায়েতে আবির- ছবি না তুললে মানায়?
হ্যাসট্যাগ  হোলি- পিক দিতে হবে সকল সোশ্যাল মিডিয়ায়।
পিকে সেল্ফিতে ব্যস্ত এমনই খেয়ালই ওরা করেনি,
বাইকে চাবি লাগানই ছিলো, সেটাকে ওরা খোলেনি।
বুড়ির চোখে পড়তেই বুড়ি জামাইকে গেলো বলতে
হঠাৎই বুড়ির হাত চেপে বুড়ো বললো বুড়িকে থামতে।
বুড়োর চোখেতে দুষ্টুমি মাখা অদ্ভুত এক চাহনি
বুড়োর চোখেতে এমন দৃষ্টি বহুকাল বুড়ি দেখেনি।
মেয়ে জামাই যখন ব্যস্ত গ্রুফি, সেলফি পিকে
সেই সুযোগেই বুড়ি নিয়ে বুড়ো স্টার্টটি দিলো বাইকে।
যদিও জানে ফিরে আসতেই জুটবে কপালে লাঞ্ছনা
কিন্তু ফাগুনে মাতাল প্রকৃতি কোনো বাধাই মানছে না।
বাইকেতে ওরা আবিরে ফাগুনে ঐক্যতানের মতো
গাইছে শুধুই- এই পথ যদি না শেষ হয়,
তবে কেমন হতো তুমি বলোতো!


🌸-------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০৩)

বসন্তের সুররাএি রায়হানের গল্প 😍
কলমে - নিশিতা নাজনীন নীলা আল মাওয়াকিফ

পাহাড়ি নদীর কোল ঘেঁষে বিরাজমান পুকুরকুল গ্রাম। বসন্ত এলেই গ্রামের প্রতিটি ক্ষুদ্রতম কোণ যেন উদ্দীপ্ত হয় মাটির ঘ্রাণে, পলাশের পল্লবে, কোকিলের কলতান শিশিরমুক্ত ঘাসের কণায়। সকালবেলার নীরবতা ভেঙে দিয়ে কোকিলের ডাক যেন জীবনের অদৃশ্য বার্তা পৌছে দেয়। ধানের ক্ষেতের সোনালি আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, প্রতিটি কণায় বসন্তের সোনালী স্পর্শ রেখে।
 
সন্ধ্যার প্রারম্ভে, রাএি বাগানের পাথেয়পথ ধরে ধীর পা চালাল। মাটির ঘরবাড়ি বাঁশের বেড়ার মধ্য দিয়ে হাওয়া ভেসে যাচ্ছে প্রতিটি কণা যেন বসন্তের গোপন গল্প শুনছে। তার হাতে ছোট্ট নোটবই, যেখানে সে বসন্তের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি গোপন আবেশ নিবিড়ভাবে লিখে রাখে। আজ রাএির উদ্দেশ্য একটাই রঙিন ফুলের সন্ধান।
 
ফুলের মতো বাঁচতে জানলে মানুষও মনোমুগ্ধকর হয়,” রাএি নিজেই গুমরানো হাসি দিয়ে বলল। বসন্ত তার কাছে শুধুমাত্র ঋতু নয় এটি অনুভূতির এক বিস্ময়কর অধ্যায়। গ্রামের প্রতিটি ঘরে বসন্তের আগমন আনন্দের বার্তা বয়ে আনে, কিন্তু তার অন্তর অন্যরকম উচ্ছ্বাসে পূর্ণ। রাস্তার ধারে ফুন্সুরা, গুলমোহর পলাশের পল্লব হাওয়ায় লাল-কমলাল আলো খেলে যাচ্ছে। রাএি একটি গাছের ছায়ায় বসল। নোটবই খুলে কলম তুলে নিল।

লিখতে শুরু করল...

"আজ বসন্ত এল। মাটির ঘ্রাণে ভরা গ্রাম নীরবতা থেকে উদ্ভাসিত হলো। ফুলের রঙে প্রাণ জুড়ে যায়। কোকিলের ডাক মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মুহূর্তই আশার বার্তা বয়ে আনে। প্রকৃতির প্রতিটি কণায় বসন্তের আত্মা প্রবাহিত হচ্ছে।"
 
ঠিক সেই মুহূর্তে, পাশের বাগান থেকে এক অদ্ভুত সুর ভেসে এলো। রাএি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল রায়হান, গ্রামের কিশোর, বাঁশি হাতে বসন্তের সুর বাজাচ্ছে। বাতাসে তার বাঁশির সুর ঝর্ণার মতো নদীর জলে মিশে যাচ্ছে। রাএির অন্তরও অনন্ত আনন্দে ভরে উঠল।

রাএি! তুমি এখানে?” রায়হানের কণ্ঠে এক অদৃশ্য আলোর ঝিলিক।

হ্যাঁ, বসন্তের গল্প লিখছি,” রাএি হেসে বলল।

রায়হানের চোখে ঝিলমিল আলো সে বলল, “তোমার লেখা শুনতে চাই। হয়তো আমার সুর তোমার কথার সঙ্গে মিলিয়ে বসন্ত আরও রঙিন হয়ে উঠবে।
 
রাএি বাঁশির সুরে মন দিল। রায়হানের সুর তার লেখা মিলিয়ে তৈরি করল এক অনন্য আবেশ যেখানে ফুলের ঘ্রাণ, কোকিলের ডাক, হৃদয়ের গোপন আশা সব মিলিয়ে একাকার। গ্রামের ছেলে-মেয়ে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলেই বসন্তের আনন্দে মত্ত। নদীর ধারে নীলিমার ছোঁয়া, বাগানে রঙিন ফুল, আকাশে সোনালি সূর্য সব মিলিয়ে যেন স্বপ্নের একটি জগত।
 
রাএি লিখতে লিখতে ভাবল...

মানুষের অনুভূতি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিত হলে বসন্ত হয়। এটি কেবল ঋতু নয়, একটি অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ আবেগের প্রতিফলন।” দিন যত অগ্রসর হলো, রাএির লেখা রায়হানের সুর আরও গভীর হয়ে উঠল। গ্রামের রাস্তায় শিশুরা দৌড়াচ্ছে, মুরগিরা ডিম দিয়েছে, নদীর পাড়ে মাছেরা আনন্দে নাচছে। রাএি লিখল
বসন্ত শুধুই রঙ নয়।

এটি জীবনের ছন্দ, আমাদের প্রত্যেক অনুভূতি, আশা স্বপ্নের মিলন। প্রতিটি শব্দ আর সুর যেন এক অদৃশ্য সেতু গড়ে, হৃদয়কে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।” সন্ধ্যা নেমে এল। সূর্য তার সোনালি আলো নদীর জলে মিশিয়ে যাচ্ছে, আর চাঁদ ধীরে ধীরে উঠে আসছে। রাএি রায়হান বাগানের শেষ প্রান্তে বসল। বাতাসে ঝর্ণার মতো শীতলতা, পলাশের রঙ মিশে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। রাএি বলল

আজ বসন্তের সবচেয়ে সুন্দর অংশ আমি লিখেছি আমাদের গল্প।

রায়হান হেসে বলল, “আমাদের গল্পই তো এই বসন্তের প্রাণ।

রাত এসে পড়ল। নদীর পানি চাঁদের রূপালী আলোয় ভেসে যাচ্ছে। ফুলের ঘ্রাণ বাতাসে ভাসছে, আর গ্রামের ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। রাএি রায়হানের হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে পূর্ণ হলো। তারা বুঝতে পারল, বসন্ত কেবল একটি ঋতু নয়, এটি মানুষের অনুভূতি, আশা স্বপ্নের অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ প্রকাশ। গ্রামের কণা-কণা যেন বসন্তের সুরে উচ্ছ্বাসিত। শিশুরা দৌড়াচ্ছে, মুরগিরা ডিম দিয়েছে, মাছেরা নদীর জলে নাচছে।
 
রাএি লিখল...

প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুর, প্রতিটি ফুলের ঘ্রাণ মিলিয়ে আমাদের গল্প হয়ে যায় বসন্তের আত্মা।
 
বসন্ত রাতের নীরবতায়, চাঁদ তার আলো, ফুলের ঘ্রাণ গ্রামের আলো সব মিলিয়ে যেন এক মায়াময় বসন্তের জগৎ। রাএি রায়হান জানল, বসন্ত কেবল ঋতু নয় এটি মানুষের আবেগ, আশা স্বপ্নের জীবন্ত প্রতিফলন।

শেষ হয়ে এলো এক গভীর, মননশীল সাহিত্যিক বসন্তের সুর যেখানে প্রকৃতি, মানুষের অন্তর, বন্ধুত্ব প্রেম একাকার হয়ে এক অনন্ত ছন্দ তৈরি করছে।


নিশিতা নাজনীন নীলা আল মাওয়াকিফ (ছদ্ম নাম)
ঠিকানা : সাতক্ষীরা জেলা কলারোয়াউপজেলাবাংলাদেশ।


🌸-------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

 (ক্রমিক নং- ০৪)


পলাশ রাঙা বসন্ত
কলমে - ড: পার্থ প্রতিম বিশ্বাস
 
মেঘমুক্ত সাগর নীল আকাশ,
পলাশ ফুলের ছোঁয়া দিগন্তে ।
বসন্ত ঋতুর রূপের মোহেতে
জুড়ায় প্রাণ,অরণ্যের প্রান্তে ।
কুহু কুহু ডাকে সঙ্গিনী খোঁজে
প্রজনন ঋতু কোকিল বোঝে।
সবুজ টিয়াদেরও মাতন লাগে,
অতীন্দ্রিয় অনুভূতি মনে জাগে ।
বসন্তেরই রঙিন তুলিতে আঁকা
গ্রামের পথ যে ধুলোবালি মাখা।
নীল আকাশের ওই ক্যানভাসে।
প্রেয়সীর হাসি নেই,শিমুল হাসে।
আজ আবিরে রাঙানো ভোরে,
বসন্ত ঋতু এলো সবার দ্বারে।
সবুজ পাতা সব গাছের ডালে,
লাল রঙ দাও প্রেয়সীর ভালে।
শুষ্ক ঝরা পাতার নূপুর পায়ে,
ছুটি শীত ঋতু প্রকৃতির রায়ে।
আজ সাজলো আবার ধরণী,
কুহু ডাক তো বসন্তের ধ্বনি।
বসন্তের গানে চলো সবে মাতি,
ফুলের ঘ্রাণ হোক পথের সাথী।
বসন্তের ছন্দ তুলুক সবার মনে।
চলো যাই আনন্দের অন্বেষণে।


🌸 -------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০৫)

মন মাতানো মোহনায়
কলমে - মিজানুর রহমান

 
মন মাতানো মোহনায় ফাগুনেরও সুগন্ধি মহুয়ায়
মন যে আমার কেমন কেমন করে,
হৃদয়ে জাগে প্রেমের নেশা ভালোবাসার তরে
প্রেমিক বিনে সেই নেশা ছটফটাইয়া মরে।
 
রক্তরাগ পলাশ শাখে কোকিল ডাকে সুরে,
কানাইয়ের বাঁশির সুরে রাধার মন পুড়ে।
ষোড়শী খোঁপায় গোঁজে হলুদ গাঁদা ফুল
বসন্ত উৎসবে প্রেমিক চিনতে
হয়না ভুল।
 
ফুল হাসে গুনগুনিয়ে অলি গায় গান
ওড়ে পাখি ঝাঁকে ঝাঁকে নীল আকাশে,
ঘেঁটু ফুলের বাহারে আকৃষ্ট হয় পথিক,
জুঁই চামেলি পলাশের গন্ধ ভাসে বাতাসে।
 
খেলে হোলি রাধা কৃষ্ণ মথুরার বৃন্দাবনে
সঙ্গে সহস্র গোপী প্রেম বিলায় সঙ্গোপনে।
এমনও মধুর বসন্ত উৎসবে
ভুলি জাতপাত
আবির রঙে রেঙে হাতে রাখি হাত।
 
খেলব হোরি এই ফাগুনে
মৈত্রীর বন্ধনে
কপোলে মাখাব রং মিলেমিশে প্রেমের আহ্বানে।
সাম্যের মন্ত্রে ভালোবাসা বিলাও প্রাণে প্রাণে।


🌸-------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০৬)

অন্য দোল
কলমে - অর্চনা নাগ মাইতি

আজ দোলপূর্ণিমা ---
এমনই এক দোলের দিনে তুমি গোলাপি আবিরে রাঙিয়েছিলে আমায়,
খোঁপাটিতে গুঁজে দিয়েছিলে লাল পলাশ।
পাশের বকুল ডালে ডেকে উঠেছিলো বৌ কথা কও পাখি,
পলাশ-শিমুল-কৃষ্ণচূড়া মেতেছিলো সিঁদুর খেলায়,
তোমার চোখে অব্যক্ত ভালোবাসার ভাষা।
 
আমি লজ্জায় লাল---
ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম তোমার দেওয়া রঙ।  পারিনি--
রঙে যে রঙিন হয়েছিলো আমার হৃদকমল।
তারপর হাতে হাত রেখে কেটে গিয়েছে একুশটি বসন্ত,
মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠেনি ভালোবাসার কথা।
একদিন হঠাৎ দমকা হাওয়ায় সব ওলট-পালট ---
 
আজও দোলপূর্নিমা --
মনে মনে ঠিক করলাম একুশটি লাল পলাশে তোমায় সাজিয়ে ,
জানাবো আমার ভালোবাসার কথা
 নিভৃতে , নির্জনে---
 
আজ পূর্নিমারাতে  আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে
একাকী---

আলোর বন্যায় ধুয়ে যাচ্ছে আমাদের শরীর
ভালোবাসার সাক্ষী  আকাশের শত শত নক্ষত্র
তোমার চোখে চোখ রেখে পড়তে চাইলাম
ভালোবাসার ভাষা,
তোমার বুকে একুশটি লাল পলাশ রেখে কান পাতলাম,
শুনতে চাইলাম তোমার হৃৎস্পন্দন
চিৎকার করে বলতে লাগলাম
"আমি তোমায় ভালোবাসি, ভালোবাসি
আজও ভীষণ ভালোবাসি"

🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০৭)

                                                         বসন্তের রঙে মানবতার উৎসব
কলমে - তপন বৈদ্য

বাংলা ঋতুচক্রে বসন্ত এক অনন্য সৌন্দর্যের নাম শীতের রুক্ষতা পেরিয়ে প্রকৃতি যখন নতুন প্রাণে জেগে ওঠে, তখনই আসে বসন্ত প্রকৃতির এই নবজাগরণকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বসন্ত উৎসব বসন্ত শুধু একটি ঋতু নয়, এটি আনন্দ, সৌন্দর্য, প্রেম মানবিকতার এক রঙিন প্রকাশ তাই বসন্ত উৎসব বাঙালির সংস্কৃতি ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে যুগ যুগ ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে
 
বসন্তের আগমনে প্রকৃতির রূপ যেন এক মুহূর্তে পাল্টে যায় শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, আম্রকুঞ্জের মুকুলে চারদিক ভরে ওঠে রঙে সুবাসে কোকিলের কুহুতান আর দখিন হাওয়ার মৃদু স্পর্শ মানুষের মনকে করে তোলে উদাসী আনন্দময় প্রকৃতির এই অপরূপ রূপই বসন্ত উৎসবের মূল অনুপ্রেরণা মানুষ তখন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আনন্দের জোয়ারে ভেসে যায়
 
বসন্ত উৎসবের ঐতিহ্য বাংলায় বহু প্রাচীন তবে আধুনিক রূপে এই উৎসবকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে তিনি বসন্তকে স্বাগত জানানোর জন্য যে অনুষ্ঠান প্রবর্তন করেছিলেন, তা আজও বিশেষ মর্যাদায় পালিত হয় এই দিনে শিক্ষার্থীরা হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাক পরে, গান, নাচ আবৃত্তির মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নেয় পরিবেশ জুড়ে তখন ভেসে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীতওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল এই ঐতিহ্য শুধু শান্তিনিকেতনেই নয়, সমগ্র বাঙালি সমাজে বসন্ত উৎসবকে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে
 
বসন্ত উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সার্বজনীনতা ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণিভেদ ভুলে সবাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে একে অপরকে আবির দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো, গান গাওয়া, নৃত্য পরিবেশন করাসব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে সম্প্রীতির উৎসব মানুষের মনে জমে থাকা কষ্ট, দ্বন্দ্ব বিভেদ যেন এই রঙিন আবিরের সঙ্গে মিলিয়ে যায় ফলে বসন্ত উৎসব মানুষকে কাছে আনার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে
 
বাংলা সাহিত্যে বসন্তের উল্লেখ অসংখ্যবার দেখা যায় কবি সাহিত্যিকেরা বসন্তকে প্রেম, আশা নবজীবনের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন বসন্তের মাধুর্য মানুষের হৃদয়ে নতুন অনুভূতির জন্ম দেয় তাই অনেক কবিতায় বসন্তকে ভালোবাসা সৌন্দর্যের দূত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বসন্তের হাওয়ায় মানুষের মন হয়ে ওঠে সৃজনশীল উদার এই সময়ে শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতির নানা আয়োজনও বৃদ্ধি পায়
 
গ্রামবাংলায় বসন্ত উৎসবের আনন্দ আবার কিছুটা ভিন্ন রূপে প্রকাশ পায় গ্রামের মাঠে, বটতলায় বা স্কুলের প্রাঙ্গণে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় লোকগান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি এবং নাটকের মাধ্যমে বসন্তের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে ছোট-বড় সবাই অংশগ্রহণ করে এই উৎসবে শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণদের প্রাণচাঞ্চল্য এবং প্রবীণদের আশীর্বাদসব মিলিয়ে বসন্ত উৎসব হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত সামাজিক মিলনমেলা
 
বসন্ত উৎসবের একটি বিশেষ তাৎপর্য হলো প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গভীর অটুট বসন্তের সৌন্দর্য মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে আজকের পরিবেশ সংকটের সময়ে বসন্ত উৎসব আমাদের সেই বার্তাই দেয়প্রকৃতিকে রক্ষা করলেই প্রকৃতি আমাদের রঙিন আনন্দ উপহার দিতে পারবে
 
আধুনিক সময়ে বসন্ত উৎসবের উদযাপন আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন সামাজিক সংগঠন বসন্তকে কেন্দ্র করে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বসন্তের গান, নৃত্য, কবিতা এবং নাটকের মাধ্যমে মানুষ নতুন করে সংস্কৃতির সৌন্দর্য অনুভব করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বসন্ত উৎসব এখন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, যেখানে মানুষ নিজেদের আনন্দ সৃজনশীলতা ভাগ করে নেয়
 
তবে বসন্ত উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি আমাদের কিছু দায়িত্বও রয়েছে এই উৎসব যেন কখনোই অসংযম বা অশালীনতায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে সম্মান জানিয়ে এবং মানবিক মূল্যবোধকে সামনে রেখে বসন্ত উৎসব উদযাপন করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য
 
সবশেষে বলা যায়, বসন্ত উৎসব শুধু একটি আনন্দের দিন নয়; এটি বাঙালির হৃদয়ের উৎসব এটি মানুষকে নতুন করে জীবনকে ভালোবাসতে শেখায় প্রকৃতির রঙ, সুর সুবাসে মানুষ তখন নতুন আশার আলো খুঁজে পায় বসন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়জীবন যত কঠিনই হোক, একদিন না একদিন নতুন ফুল ফুটবেই তাই বসন্ত উৎসবের রঙিন আনন্দ আমাদের জীবনে আশাবাদ, সৌন্দর্য মানবিকতার বীজ বপন করে
 
এই কারণেই বসন্ত উৎসব বাঙালির সংস্কৃতিতে এক অমলিন অধ্যায় হয়ে আছে যতদিন প্রকৃতির বুকে ফুল ফুটবে, কোকিল ডাকবে, আর মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা থাকবেততদিন বসন্ত উৎসব তার রঙিন আনন্দ নিয়ে মানুষের জীবনে ফিরে আসবে


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০৮)

বসন্ত
কলমে - অজয় চক্রবর্তী
 
বসন্ত আজ বুঝিয়ে দিল দখিন হাওয়া এসে,
নীল আকাশে টুকরো মেঘ হাওয়ায় ভেসে ভেসে।
শীত চলেছে বিদায় নিয়ে বোঝায় তা আভাসে,
রং ফাগুনের বার্তা আসে বসন্ত বাতাসে।
 
মিষ্টি রোদের হালকা ছোঁয়া ভীষণ লাগে ভালো,
সকল আঁধার ঘুচিয়ে দিয়ে জ্বলুক যত আলো।
রঙিন হৃদয় আপন মনে কাউকে পেতে চায়,
পাহাড় চূড়ায় সূর্য যেন কি শোভা বাড়ায়।
 
সবুজ কুঁড়ি গেছে ভরে শিমুল গাছে গাছে,
লাল শিমুলের অপেক্ষাতে দুচোখ জেগে আছে।
শিমুল এলো মন রাঙালো কারো অপেক্ষাতে,
প্রকৃতি তার নতুন রুপে ভরায় ধরণীতে।
 
নানান রঙের পলাশ ফুলে বাগান গেছে ভরে,
আগুন রাঙা পলাশ যেন মনকে উদাস করে।
শিমুল, পলাশ একই সাথে ঝরে পথে পথে,
রঙের বাহারেতে মন চায় তো রঙিন হতে।
 
ওই শোনা যায় মিষ্টি সুরে কোকিলা গায় গান,
এ বন ও বন সুরে সুরে জুড়ায় মন প্রাণ।
এইতো এলে যাবে চলে আসবে বছর পরে,
তোমার আগমনের আশায় হৃদয় ব্যাকুল করে।


🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ০৯)

যাযাবর !
কলমে - রকিবুল ইসলাম

তোমার আঁখিতে রেখে আঁখি থাকতে চেয়েছি দিবানিশি।
পথভ্রষ্ট তোমার নয়নের আলোর ছায়ায় 
ঢাকা পড়েছে আমার সকল আহাজারি।
করুণা লোভী কাতর আমি মত্ত হয়েছি অরণ্য রোদনে।
আমার অরণ্যের সব আয়োজন থমকে গেছে 
ব্যথার বিষের বিষাক্ত দংশনে।
সংহতি জানিয়ে এগিয়ে এসেছে পাহাড়,
নদী,সাগর,বনানী।
ভাসিয়ে দিয়েছে মধুর আলিঙ্গনের উষ্ণ পরশের সান্নিধ্যতায়।
তবুও,একজন তুমি বোঝনি আমায়।
ধুঁপকাঠি যেমন পুড়তে থাকে অবিরত
আমিও উড়িয়ে চলেছি ধোঁয়া তার মত।
অবুঝ মন আমার শিখতে বলে ঝর্ণার কাছে,
যেমন করে বিলিন হয় সে সাগর,
নদীতে নিজের সর্বস্ব বিকিয়ে।
স্বপ্ন বুনি মানস মাঝে,
মরে গিয়ে যদি থাকি গো বেঁচে,থাকি তোমার অন্তর মাঝে!
সেটাও তো বেঁচে থাকা হবে
দেদিপ্যমান রবি অস্ত যায় যেমন রাঙা আবিরে স্নাত হয়ে,
আমারেও দিও বিদায় বিস্তীর্ণ বালুচরে হারিয়ে যাওয়া রাঙা গোধূলিতে।
যাযাবর আমি চলে যাব তোমায় মুক্তি দিয়ে এই ধরণী ছেড়ে।



🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১০)
 

                                                                       অন্য দোল
                                                      কলমে - প্রোজ্জ্বল রায় চৌধুরী

 
আবীরের রঙ ভাসছে আকাশে।
প্রেমের  গন্ধ বাতাসে।
পলাশে শিমুলে রক্তিম সাজে।
মনে বসন্ত হাসে।।
রং পিচকারি- আবীর গুলালে,
আজকে প্রাণের দোল।
প্ৰিয় পরিজন, পরিবার নিয়ে,
আনন্দ হিল্লোল।।
 ক্লান্ত প্রাণের গ্লানি মুছতেই
মেতেছি রঙের খেলায়,
রঙে, গানে আর খাওয়া দাওয়াতেই,
দিন যে যাবে হেলায়।।
কিন্তু,,
আনন্দের এই খুশির দিনেও 
ভেবেছি কি এক বারও
সীমান্তে আজও  মোতায়েন সেনা,
নেই তো ছুটি কারও।
রং -পিচকারি নেই তো গো হাতে,
দু - হাতে ভরা দায়িত্ব,
ওদের কাঁধেই দেশের রক্ষা,
স্বাধীনতা   স্থায়িত্ব।
ওদেরও তো আছে  ঘর পরিবার,
আছে ভালোবাসা প্রিয়জন।
জীবনের সব চাহিতাও আছে,
ঠিক আমাদেরই মতোন।।
তবু সব ভুলে চিরদিন ওরা
দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ।
বুকের রক্তে হোলি খেলে ওরা।
আগলে রাখছে দেশের মান।।
নিজের প্রাণের পরোয়া না করে,
রক্ষা করছে দেশ।
রক্ষা করছে আমাদেরও ওরা,
সয়ে   দুর্বার ক্লেশ।।
আমার দেশের বীর  সেনানি,
তোমরা আছো তাই
আমার সবাই উৎসবে মাতি,
বাচাঁর সুযোগ পাই।।
দেশের জন্য দিয়েছ তোমরা
নিজের প্রাণের বলিদান।
আমরা দেশের আম জনতা,
দিয়েছি কী তার  ঠিক মান??
তবু,,
দোলের এই শুভেচ্ছা টুকু  দুহাতে নিয়ে এলাম,,
ভারতীয় সেনা, তোমাকে জানাই,
আমার প্রাণের সেলাম।।


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১১)

বসন্তের ছোঁয়া পরিবেশে
কলমে - আলমগীর হোসেন
 

শীতের নীরবতা ভেঙে
আলোর নরম পায়ে
একদিন বসন্ত এসে দাঁড়ায়-
মাটির দরজায় কড়া নাড়ে ধীরে।
 
গাছের ডালে ডালে
ঘুম ভাঙে কুঁড়ির,
পলাশের আগুনে রঙিন হয় পথ,
শিমুলের লাল চিঠি উড়ে যায় বাতাসে।
 
নদীও যেন নতুন সুরে বাজে,
ঘাসের বুকে শিশিরের হাসি,
দূর আকাশে নীলের গভীরতায়
পাখিরা লেখে স্বাধীনতার কবিতা।
 
বসন্ত মানে শুধু ফুল নয়-
এ এক অদৃশ্য স্পর্শ,
যেখানে ক্লান্ত পৃথিবী
আবার নতুন করে বাঁচতে শেখে।
 
মানুষের মনেও তখন
সবুজের জন্ম হয়,
ভাঙা স্বপ্নের ভেতর থেকে
আলোয় ভেজা আশা মাথা তোলে।
 
প্রকৃতি যেন মায়ের মত
তার রঙিন আঁচল মেলে ধরে-
বলতে থাকে নীরবে,
দেখো, ধ্বংসের পরেও সৃষ্টি আছে।
 
তাই বসন্ত এলে
শুধু ঋতু বদলায় না-
বদলে যায় মানুষের ভেতরের আকাশ,
পৃথিবীও হয়ে ওঠে
একটি নতুন কবিতার প্রথম পঙক্তি।


আলমগীর হোসেন
ঠিকানা : সাভারঢাকাবাংলাদেশ


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১২)

বসন্তের প্রথম প্রহরে
কলমে: তামিম আদনান

বসন্ত মানেই নতুন রং, নতুন স্বপ্ন, নতুন অনুভবএই বাক্যটি নীলিমা ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছে। কিন্তু এ বছরের বসন্ত যেন তার জীবনে সত্যিই এক অনির্বচনীয় অধ্যায় খুলে দিল। শীতের কুহেলিকা সরে গিয়ে যখন আম্রকুঞ্জে মুকুলের সুবাস, কৃষ্ণচূড়ার রাঙা অগ্নিশিখা, আর কোকিলের মধুর ডাক একসাথে মিশে এক মোহময় আবেশ তৈরি করছিল, তখনই সে প্রথম বুঝেছিলপ্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে প্রেমের গোপন সংকেত।

সকালটা ছিল ফাল্গুনের প্রথম দিন। শহরের বাতাসে রঙিন ওড়নার উড়ান, কলেজ ক্যাম্পাসে হাসির ঝরনা, আর আকাশে তুলোর মতো মেঘের ভেলাসব মিলিয়ে এক অনিন্দ্য মাধুর্য। নীলিমা বাংলা সাহিত্য বিভাগের ছাত্রী। সে কবিতা ভালোবাসে, শব্দের ভেতর দিয়ে মানুষের আত্মাকে ছুঁতে চায়। তার মনে তখনও কোনো নির্দিষ্ট মানুষের ছবি ছিল নাশুধু ছিল এক অদৃশ্য প্রতীক্ষা।
কলেজের অডিটোরিয়ামে বসন্তবরণ অনুষ্ঠান। মঞ্চে যখন রবীন্দ্রসংগীত বেজে উঠল-

ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল” -

তখন তার চোখে হঠাৎ পড়ল এক অপরিচিত মুখ। সাদা পাঞ্জাবি, হলুদ গামছা, গভীর মনোযোগে কবিতা পাঠ করছে ছেলেটি। তার কণ্ঠে এমন এক আবেগ, যেন প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসছে।

ছেলেটির নাম আরিয়ান। ইতিহাস বিভাগের ছাত্র। তার কণ্ঠে যখন জীবনানন্দের কবিতা ধ্বনিত হলো, অডিটোরিয়াম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। নীলিমা অনুভব করলকেউ যেন তার ভেতরের নিঃসঙ্গতার দরজায় মৃদু কড়া নাড়ছে।

অনুষ্ঠান শেষে করিডোরে দেখা। হালকা বাতাসে ওড়না উড়ছে। আরিয়ান হেসে বলল,

- “আপনি কি বাংলা বিভাগের?”

নীলিমা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,

- “হ্যাঁ। আপনার কবিতা পাঠ খুব সুন্দর ছিল।

—“ধন্যবাদ। তবে আজকের আসল কবিতা তো প্রকৃতি নিজেই লিখেছে।

সেই কথোপকথনের ভেতরেই যেন বসন্তের প্রথম প্রহরের সূচনা হলো।

দিন গড়াতে লাগল। লাইব্রেরির নির্জন কোণে, কলেজ ক্যান্টিনের চায়ের কাপে, কিংবা বকুলতলায় বসেতাদের আলাপ গভীর হতে থাকল। আরিয়ান ইতিহাসের প্রাচীন প্রেমকাহিনি বলত, নীলিমা শোনাত কবিতার পঙক্তি। দুজনের কথায় কথায় গড়ে উঠল এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।

একদিন বিকেলে তারা নদীর ধারে গেল। সূর্যাস্তের রঙে আকাশ রাঙা। বাতাসে কাশফুলের দোল। নীলিমা হঠাৎ বলল,

—“তুমি কি বিশ্বাস করো, প্রেম হঠাৎ করেই আসে?”

আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—“প্রেম আসে না, সে ধীরে ধীরে জন্ম নেয়যেমন বসন্তের ফুল।

সেদিন তাদের হাত ছুঁয়ে গিয়েছিল প্রথমবার। কোনো শব্দ ছিল না, শুধু হৃদস্পন্দনের সুর।

কিন্তু জীবনের গল্প তো শুধু ফুলের সুবাসে লেখা হয় না। নীলিমার পরিবার ছিল রক্ষণশীল। তারা চায় মেয়েটি পড়াশোনা শেষ করে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিক। প্রেম তাদের কাছে সময়ের অপচয়। অন্যদিকে আরিয়ান মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, নিজের স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রামী।

একদিন হঠাৎ নীলিমা জানালতার স্কলারশিপ হয়েছে। সে যাবে দূরদেশে। কথাটা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

আরিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

—“তুমি যাও। তোমার স্বপ্ন পূরণ হওয়া দরকার। আমি অপেক্ষা করব।

বসন্ত তখন শেষ প্রহরে। কোকিলের ডাক যেন একটু বিষণ্ন। বিদায়ের দিন এলো। রেলস্টেশনে ভিড়, শিসের শব্দ, আর চোখের কোণে অশ্রু। নীলিমা বলল,

—“তুমি কি সত্যিই অপেক্ষা করবে?”

—“বসন্ত যেমন ফিরে আসে, তেমনি তুমি-ও ফিরবে।

বছর কেটে গেল। দূরদেশের ব্যস্ততা, নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতিসবকিছু মিলিয়ে নীলিমার জীবন বদলে গেল। কিন্তু মাঝরাতে জানালার বাইরে চাঁদ দেখলে তার মনে পড়ে যেত সেই নদীর ধারের বিকেল। মাঝে মাঝে চিঠি আসত আরিয়ানেরলেখা থাকত ইতিহাসের নতুন তথ্য, আর শেষে একটি লাইন

বসন্তের প্রথম প্রহর এখনো তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।

চার বছর পর, এক ফাল্গুনের সকালে নীলিমা ফিরে এলো। কলেজ ক্যাম্পাস বদলে গেছে, কিন্তু বকুলতলা একই আছে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ানআরো পরিণত, আরো দৃঢ়।

দুজনের চোখে চোখ পড়তেই সময় যেন থমকে গেল।

নীলিমা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

—“আমি ফিরে এসেছি।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,

—“আমি জানতাম।

সেই দিন ছিল আবার ফাল্গুনের প্রথম দিন। কোকিল ডেকেছিল, কৃষ্ণচূড়া রাঙা হয়েছিল। বসন্ত যেন তাদের প্রতীক্ষার পুরস্কার দিল।

পরবর্তীতে তারা একসাথে একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলে। সাহিত্য, ইতিহাস আর ভালোবাসার গল্প ছাপায়। তাদের জীবনে ঝড় এসেছে, মতভেদ হয়েছে, কিন্তু বসন্তের প্রথম প্রহরের সেই অনুভূতি কখনো মুছে যায়নি।

এক সন্ধ্যায় নীলিমা বলল,

—“তুমি জানো, আমি দূরে গিয়ে বুঝেছিপ্রেম মানে শুধু একসাথে থাকা নয়, বিশ্বাস করা।

আরিয়ান বলল,

—“আর বসন্ত মানে শুধু ফুল নয়, অপেক্ষার পর ফিরে আসা।

তাদের ঘরে এখন ছোট্ট এক বাগান। সেখানে কৃষ্ণচূড়া, বকুল, আর শিউলি। প্রতি ফাল্গুনে তারা প্রথম প্রহরে একসাথে বসে চা খায়। মনে মনে ধন্যবাদ জানায় সেই দিনটিকেযেদিন বসন্ত তাদের জীবনে প্রেমের বীজ বুনেছিল।

বসন্তের প্রথম প্রহর তাই শুধু ঋতুর সূচনা নয়এ এক অনন্ত প্রতিশ্রুতি, এক অবিনশ্বর বিশ্বাস।

ফুল ঝরে যায়, কোকিল থেমে যায়, কিন্তু সত্যিকারের প্রেম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরন্তন হয়ে থাকে।

আর যখনই ফাল্গুনের বাতাসে নতুন রং ভেসে ওঠে, নীলিমা আর আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝে নেয়

তাদের গল্প এখনো চলছে, বসন্ত এখনো ফুরোয়নি।


🌸-------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১৩)
চাই না রক্তের হোলি
কলমে: সর্বানী দাস

রক্তে সিক্ত মানবতা  লা শের হোলি খেলে,
শিশুর চোখে করাল ভীতি  বিভেদের বিষাক্ত রঙে -
আর্তনাদের চারা পুঁতে বুকে পুড়ছে কুমারীর স্বপ্ন,
মহাউৎসব লাল লাল ছোপ ঝরে পড়া প্রাণ পথে ঘাটে -
দেওয়ালে রঙের হোলি খেলা নিয়ে ক্ষত বিক্ষত ইতিহাস,
ক্ষমতার ধ্বজা পতপত করে উড়ছে অহংকারে..
মানুষের শরীর লজ্জা ঢেকেছে উলঙ্গ চিৎকার -
ভাষা-জাত,ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদের কাঁটাতারে বারুদের গন্ধে,
মানুষের মন শিশুকেই শিকার করে চুপিচুপি।
হিংসার স্লোগানে দোলে মানবতা
বসন্তের ফাগে অস্ত্রের উৎসব..
শূন্য মায়ের কোলে ঘুমন্ত পৃথিবী
নিবু নিবু প্রতিবাদ শ্রমিকের ঘামে
শিক্ষার পাতা খন্ডে খন্ডে রাস্তায় পদপিষ্ঠ
পাথর উঠেছে তরুণের হাতে ত্যার সংলাপে
পৃথিবী বড়ো অসহায় বিকিয়ে অস্তিত্ব।
চাই না এমন রক্তের হোলি, বিভাজনের মনুষ্যত্ব
চাই না লিখতে বারুদের গন্ধে জীবন্ত লা শের অক্ত।
সমতার দ্বীপ জ্বালবো মোরা সাম্যের আবির ছড়িয়ে,
আমরা গর্ব নতুন পৃথিবী শান্তির বার্তা ভরিয়ে।
হরবোলাদের প্রানে ছুঁয়ে দেবো মায়াভরা রূপরেখা,
কন্ঠে তুলব ঐক্যের গীতি শান্তির চিত্রলেখা।
আকাশের বুকে গোধূলি আবির মাখবে নদীর জলে,
বসন্তে হবে প্রেম প্রীতি সুখ  মায়াভরা ধরা তলে।


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১৪)
আনন্দ উৎসব
                                                              কলমে: মঞ্জুলা আচার্য্য

ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে এই ধরায়,
বিরাম বিহীন কোকিলের কুহুতান মন ভরায় ।
লাল কৃষ্ণচূড়ার ফুলে রাজপথ সাজে,
সংগীতের সুললিত কলতান কানে বাজে ।

শিমুল পলাশে আবিরের রঙ লাগে,
হৃদয় বীণায় প্রীতি অনুরাগ জাগে ।
মধুপ গুঞ্জনে মুখরিত ফুল বন ,
দখিনা বাতাসে তনু মনে ভরে শিহরণ ।

নব কিশলয় ছেয়ে যায় তরু শাখে,
বউ কথা কও পাখি কেবলই ডাকে  ।
সারা ভুবনে রঙের খেলায় ওঠে মেতে ,
চায় রে সবাই খুশির পরশ পেতে ।
 
বসন্তের ছোঁয়ায় সব অপরূপ লাগে,
ধরণী সাজে নব সাজে ফাগুন রাগে ।
আনন্দ উৎসব ছেয়ে যায় জগত সারা ,
অবিরাম বয়ে চলে খুশির ঝরণা ধারা ।



🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১৫)
আমি ভালো নেই
কলমে: শ্যামল কুমার মিশ্র
 
সাদেক স্যারের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে
খানিক আগেই দুলে দুলে গাইছিলেন
'টুইংকেল টুইংকেল লিটিল স্টার'...
স্যারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গাইছিল নার্সারির শিশুরা
ছোট্ট ফুলের মতো দুলছিল ওদের মাথা
ছোট্ট হাতগুলোর স্পর্শে রঙিন হয়ে উঠছিলেন স্যার
সবাই আবিরের রঙে রাঙাতে চায়...
 
হঠাৎ একটা শব্দ হলো
লুটিয়ে পড়ল কয়েকটি ফুল
আতঙ্কে দৌড়ে এসে গলা জড়িয়ে ধরল কেউ কেউ
পলাশ হাতে শুয়ে রয়েছে সালমা
স্যারের হাতে পলাশ দিতে আসছিল
মুখ থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত এসে মিশেছে পলাশে
রক্ত-পলাশ যেন বড় ম্লান আজ
চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে কত ফুল
দোলের রঙে রাঙিয়ে দিতে এসেছিল ওরা
হিংসা কেড়ে নিয়েছে ওদের...
 
সাদেক স্যারের মন ভালো নেই।
চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে
রিম্পি, সালমা, আরশাদদের মুখ
চাপ চাপ ধোঁয়ার মাঝে যেন ভেসে আসছে সেই কণ্ঠস্বর-- 
'টুইংকেল টুইংকেল লিটল স্টার... '
সালমা এসে যেন কানে কানে বলছে--
 হাউ ইউ আর স্যার...
অস্ফুটে স্যার যেন বলে ওঠেন--
'আমি ভালো নেই, আমি ভালো নেই সোনা...'



🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

 (ক্রমিক নং- ১৬)
কেন বসন্ত তুমি--
কলমে - সমীরণ গোলদার

কেন দেখলে তোমাকে, ছুটে যেতে ইচ্ছে
জাগে মনে একবার ছুঁতে
আমি পারিনা উঠতে
 একদম নুলো হযে গেছি
'দিনের জ্বরে
আগের মতো পারিনা ঘুরে বেড়াতে
তোমার সাথে
বিভিন্ন দিকে উড়ে বেড়াতে
মলয় সমীরে
শাড়ীর আঁচলে নযনাভিরাম
দৃশ্য দেখতে,সুগন্ধি ছড়াতে ছড়াতে
কোথায ভালোবাসা পাব শুধু একবার ছুঁতে
হয়তো এজন্মে আর হবেনা
কোন মতে
ভালো বাসা খুঁজতে যেতে
দেবে শুধু অবহেলা, এমনি
কত বসন্ত যাবে
শুধু হবে দেখতে
তাকিয়ে দেখবে না কেউ ফিরে
তাকাবে না ফাগুন চোখে
আমার দিকে, তাই মনে হয়
বসন্ত তুমি, অসহাযের না মোটেও


🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১৭)

বসন্ত
কলমে - শ্রীকান্ত ঘোষ 
 
 
রঙ মাখে সংসার ,রঙ মাখার দিন
তুমি নেই বলে ,আমি উদাসীন
বসন্তে বাতাসে মিলেছে সানাইয়ের সুর ,
আজও কী রইবে এতটা দূর ?
সকালের মিঠে আলো এসেছে ঘরে ,
তবুও মনটা আমার তোমার পরে
স্বপ্ন দেখি ক্লান্তির, ঘুম কাটতে চায় না
দেখবে জানি তুমি সময়ের আয়না
ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখি
রাস্তা ঘাট আবির রঙে মাখামাখি ,
একদল করে যায় প্রভাত ফেরী
কেটেছে অনেকটা সময় হয়েছে দেরি ,
সব কিছু এসে দেখে ,
স্মৃতি পটে গুছিয়ে রেখে
করলাম আর এক বসন্ত পার,
জীবন খাতায় বাড়লো আরও কিছু ধার।


 🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১৮)

 
আমার বসন্ত হারিয়ে গেছে
কলমে - সুমি সাহা


বসন্ত এসে গেছে জানি
তুমি নেই কাছে তাই,
আনন্দ নেই মনে
তুমি কোথায় জানতে চাই।।

কোকিলের কুহু কুহু কলতান
শুরু হয়ে গেছে,
শিমুল পলাশ কৃষ্ণচূড়া
গাছে ফুটে আছে ।।
 
তুমি নেই মোর পাশে  
চোখের জলে ভাসাই আমি,
তোমাকে ছাড়া চলেনা আমার
পাবোনা কাছে জানি।।
 
এই আনন্দের বসন্ত যে
বলে আমার দিকে চেয়ে,
এসো এসো রাঙাবো তোমায়
চলে যাবো আমি রাঙিয়ে।।
 
বসন্তকে জানাই আমি
সে যে গেছে আমাকে ফেলে,
আজ কতদিন হলো
গেছে বহুদূরে চলে।।
 
আসবেনা আর কোন বসন্ত
ফুটবে না বনে ফুল আর
আমার বাগান শুকিয়ে গেছে
কেন ডাকো বসন্ত বারবার।।



   🌸----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ১৯)

বসন্তপ্রিয়ার বনপলাশীর পদাবলী
কলমে - শ্রী সুজন


বসন্তপ্রিয়া তুমি আজ বনপলাশীর পদাবলী
লিখলে নবরংকলেবরে এই রাঙামাটির সরানে,
শান্তিনিকেতনী দোল বসন্ত উৎসবের শ্রদ্ধার্ঘ্য দিলে
চিররঙিন 'হোক কলরবে' রবিঠাকুরের শ্রীচরণে
কৃষ্ণচূড়ার নতুন আশা,রাধাচূড়ার নতুন প্রাণ
নতুন রঙশিমুলিয়ার আমের বোলে নেশাতুর হোক বসন্তপ্রিয়ার গান,
বাউলিয়া একতারায় সুররঙিন হোক
রঙ্গবতী কোকিলার কুহু কুহু কলতান
তোমার,আমার মনফাগুনে সাঁঝবাতির রংমশাল
হয়ে জ্বাললে তুমি রামধনু বাসন্তিকা প্রদীপ,
সোহাগী রংসগুনের সগুনপাখি হয়ে
আমার হৃদয়ের রংগুলালে এঁকে দিলে চিরবাসন্তী দোলঝড়ের অন্তরীপ
বসন্তপ্রিয়া তুমি আজ রংফাগুনিয়া রক্তিম আগুনে সত্যিই অনন্যা,
আগুনপাখির রং মাখানো পলাশবর্ণিকায় যেন অগ্নিকন্যা,
তোমাকে চাই বারে বারে এই পলাশসুরঞ্জিত শান্তিনিকেতনে
তুমি,আমি চিররঙিন হবো শুধুই বসন্তপ্রিয়ার হৃদয়রাঙা অঙ্গনে...


শ্রী সুজন
টালাশ্যামবাজারকলকাতা


   🌸---------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ২০) 

রঙধনু বিকেলের স্বপ্ন
কলমে - রকিবুল ইসলাম

আজ ভোর হইতেই বর্ষা নামিয়াছে। ভারী বর্ষণ যাহারে বলিয়া থাকি তেমনটা নয় আর কি! কথার গৃহ হইতে অফিস দুই কিলোমিটারের মত দূরত্ব হইবে। একখানি ছাতা লইয়া বৃষ্টি উপেক্ষা করিয়া কিছু দূর হাঁটিয়া তারপর একটা রিকশায় চাপিয়া সে আজ অফিসে আসিয়াছে। আকাশ অবশ্য রেইনকোট পরিয়া পায়ে হাঁটিয়াই অফিসে আসিয়াছে। আকাশের বাড়ি হইতে অফিসের দূরত্ব মাত্র আধা কিলোমিটার হইবে। আকাশ দূর হইতে কথাকে দেখিয়াই কহিল: সু-প্রভাত বৃষ্টিস্নাত মহারাণী!

আহ্! এই প্রভাতের বৃষ্টি! আধ ভেজা শাড়িতে বর্ষা সিক্ত আপনি!বেশ ভালোই লাগিতেছে।আপনার গৃহ তো অফিসের সন্নিকটে তাই এমন কথা নি:সৃত হইতেছে মুখ হইতে: বলিল কথা। আমার মত দূর হইতে আসিলে বোঝা যাইত মহারাজের কি হাল! ঠিক আছে বাবা আমি পরাজয় বরণ করিলাম: আকাশের সরল সহজ স্বীকারোক্তি আত্মসমর্পণ। পরাজয় না মানিয়া কি উপায় আছে! আমি যে মহারাণী! আপনার মহারাণী:কথার অতি আত্মবিশ্বাসী উক্তি।

আকাশ: দুপুরের খাবার আনিয়াছো না কি?

কথা:জ্বী না মহারাজ! প্রাতঃ কাল হইতেই বর্ষা আকাশে মেঘের ঘনঘটা দেখিয়া কোন আহারের সংস্থান না করিয়াই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়া ছিলাম।

আকাশ: যাক! কোন ব্যাপার না। আমরা দুজনেই আজ আমাদের বাড়িতে যাইয়া দুপুরের খাবার খাইয়া আসিব।

কথা:না মশাই।আমি যাই আর আপনার পরিবার সংশ্লিষ্ট সকলে অস্বস্তিতে পড়িয়া যাক তা আমি চাহি না।

আকাশ:না না! সেটা হইবে কেন? তুমি আমার মা জননী কে তো দেখিয়াছ। তাহাকে দেখিলে কি মনে হয় উনি এহেন  কর্মকান্ড সাধন করিবেন? তাহাকে দেখিয়া কভু কি মনে হয় যে উনি বিব্রত বোধ করিবার মানুষ?

কথা: না! ঠিক তাহা নয়। তবে,বিবাহের পূর্বে ঘনঘন বরের গৃহে গমন কনের পক্ষে -শোভনীয় বৈ কি!

আকাশ:চলো আজ তাহলে আমরা বাহিরে কোন রেস্টুরেন্টে গিয়া খাইব। এতদিন তো দুজনের অভিসারের ক্ষণে পার্কে, ফুটপাতে, বিভিন্ন খোলা জায়গায় খাইয়াছি। আজ আমরা না হয় একটু দামি রেস্টুরেন্টেই মধ্যাহ্নভোজ করিলাম!

কথা: আমি রাজি বটে,তবে, ওইখান হইতেই বাড়িতে যাইবো,অফিসে আজ আর ফিরিব না।

কেমন যেন একটা অনুভুত হইতেছে। তুমি সবকিছু ঠিকঠাক ব্যবস্থা করিয়া লইবে।

আকাশ:যথা আজ্ঞা মহারাণী!সেটা তুমি আমার উপর ছাড়িয়া দাও।

বিগত দিবসের রিপোর্টের কর্ম সম্পাদন করিতেই দুপুর গড়াইয়া আসিল।

মনির (পিওন): আকাশ ভাই বস আপনাকে সালাম জানাইয়াছেন। অফিসের অন্য সকলকে মনির স্যার আর ম্যাডাম বলিয়া সন্মোধন করিলেও আকাশকে ভাই আর কথাকে আপু বলিয়া সন্মোধন করে।সেইটা অবশ্য আকাশ বলিয়াছে তাই।

আকাশ:আসতে পারি স্যার?

বস:হ্যাঁ,আসিতে পার।

বস:আচ্ছা আকাশ গতকালের কার্যাবলী কি পরিপূর্ণ রুপে সাধিত হইয়াছে না কি কিছু বকেয়া রহিয়াছে?মেইল গুলো কি প্রেরণ করা হইয়াছে?

আকাশ: গতকালের কাজ গুলো কেবলমাত্র সমাপ্ত হইল।

আকাশস্যারএকটা কথা বলিবার ছিল।

বস: বলো।

আকাশ:আপনি যদি একবার চেক করিয়া দিতেন তবে মেইলে গুলো সেন্ড করিয়া একটু বাহিরে খাইতে যাইব। দুপুরের পর একটু ব্যক্তিগত কাজ আছে।সুতরাং,আজ আর অফিসে ফিরিয়া আসিব না।

বসতাহা হইলে কিভাবে হইবে? আজকের সকল কাজ তো বকেয়া থাকিয়া যাইবে!

আকাশ:আমি আগামীকাল আসিয়া সকল কাজ একসাথে সম্পাদন করিয়া তারপর বাড়িতে যাইব, ইনশাআল্লাহ্!

বস: ঠিক আছে।যাও।তবে,কথাকে একটু বুঝাইয়া দিয়া যাও।ও যতটুকু পারিবে ততটুকু যেন আগাইয়া রাখিয়া দেয়।

আকাশস্যার!কথা সকালে অফিসে আসিতে যাইয়া ভিজিয়া গিয়াছে।ও বলিতেছিল: শরীরটাও না কি তেমন ভাল নয় তাহার।

বসতাহার মানে,সে চলিয়া যাইতে চায় আজ?

আকাশজ্বীস্যার। আগামীকাল আসিয়া সকল কাজ যথাযথ ভাবে সম্পাদন করিয়া তবেই গৃহে ফিরিব, ইনশাআল্লাহ্!

বস: আচ্ছা, ঠিক আছে।মনিরকে একটু পাঠাইয়া দাও।আমি বাসায় যাইয়া খাইয়া আসিবার পর বেশ কিছু কাজ করিতে হইবে।তোমরা অফিসের সকলে ছুটি লইতে চাহিলেও আমার বেলায় তো আর তা করিলে চলে না। ঠিক আছে,যাও।

আকাশ: (বসের কক্ষ হইতে উৎফুল্ল চিত্তে বাহির হইয়া মনির কে উদ্দেশ্য করিয়া) বস তোমাকে ডাকিতেছেন।উনি বোধকরি বাহির হইবেন।

কথা: আমার ছুটির কি কোন বন্দোবস্ত হইল?

আকাশজ্বী,মহাশয়া!সে কর্ম আমি সম্পাদন করিয়াই আসিয়াছি।

বসবাহিরে আসিয়া(পশ্চাতে মনির ব্রিফকেস হস্তে)।কি খবর!তোমরা যাওনি?

আকাশ কথা একত্রে:না স্যার এখনই বাহির হইব।

বস: ঠিক আছে।আমি তাহলে বাহির হইলাম।তোমরাও চলিয়া যাও।

আকাশ কথা: (সমস্বরে): জ্বী,স্যার!

আকাশ: চলুন মহারাণী!তবে যাত্রা আরম্ভ করা যাক।

কথা: মহারাজের আজ্ঞা শিরোধার্য!

অফিস হইতে বাহির হইয়া তাহারা একখানা রিক্সা ভাড়া করিয়া সোজা হোটেল নবাবের পৌঁছাইল।

আকাশ: (কথাকে): কি খাইবে?

কথাতুমিই বলিয়া দাও।

আকাশলেডিস ফার্স্ট।

কথাআমি শুধু সব্জি আর সাদা ভাত খাইব। তুমি কি খাইবে?

আকাশ: তুমি যা খাইবে আমিও তাই খাইব।

কথাতবে তো স্ব স্ব  গৃহে ফিরিয়া খাইলেই হইত।এইখানে আসছিলাম কেন?

আকাশ:তোমার তো শরীর খারাপ।তোমার সাথে সংহতি জানাইলাম।
কথাবাবা! তোমার সহিত কথায় জিতিয়ে সাধ্য কাহার! আচ্ছা চলো দ্রুত খাইয়া বাহির হইয়া যাই।
আকাশমাথা নাড়াইয়া সম্মতি জ্ঞাপন করিল।

আকাশবেল চাপিল।

ওয়েটার:কি খাবেন স্যার?মেনু কার্ড আছে। আকাশ:দুইটা করিয়া সব্জি ভর্তা আর দুই প্লেট সাদা ভাত।
খাবার পরিবেশন করা হইল।খাওয়া সমাপ্ত করিয়া বিল (পরিশোধ করিয়া) দুই জনেই হোটেল হইতে বাহিরে আসিল।

আকাশএখন কোথায় যাইবে?বাসায় নিশ্চয়? চলো,তোমারে বাড়িতে পৌঁছাইয়া দিয়া তারপর আমিও ফিরিব।

কথাজ্বী,না মহারাজ!আমি বাড়িতে ফিরিতেছি না।আজ তোমারে সময় প্রদান করিব।
আকাশ: তোমার তো শরীর খারাপ।
কথা: তোমার জন্য এটুকু আত্মোৎসর্গ তো করিতেই পারি আমি।
আকাশএই তুমি আমারে এত ভাল বুঝিতে পারে কিভাবে?
কথাওটা একটা গোপন রহস্য।এটা আমি প্রকাশ করিতে চাহি না।

আজ বিকালে বৃষ্টি আর আসেনি ধরায়।পূর্ব দিগন্ত রেখা বরাবর একটু উপরে সাতরঙা রঙধনুর রঙের ম্রিয়মাণ বিচ্ছুরণ।সমস্ত বিকালটা তাহারা ঘুরিয়া-ফিরায়া বেড়াইল হর্ষ-আমোদ।এরই মধ্যে আকাশ আবিষ্কার করিল কথার নেত্র হইতে বিসর্জিত হইতেছে জলধারা।

আকাশ:কাঁদিতেছ কেন?শরীর কি খুব খারাপ?
কথা:না গো! ভয়ে ভীত হইয়া কাঁদিতেছি।
আকাশ: কিসের ভয়?
কথা:তোমাকে হারাইবার ভয়।
আকাশ: তুমি তো এতদিনে নিশ্চয় চিনিয়াছ আমি কেমন!
কথা:তোমার প্রতি বিশ্বাস ছিল,আছে থাকিবেও।

আকাশ কথার চোখের জল মুছাইয়া দিতেই কথা আকাশকে জড়াইয়া ধরিল।আকাশও শক্ত করিয়া জড়াইয়া ধরিল কথাকে।

কথাএভাবেই আমাকে তোমার বক্ষ মাঝে আগলাইয়া রাখিও আকাশ।
আকাশ: তুমি তো আমার শ্বাস-প্রশ্বাস! তোমারে ছাড়া আমার চলিবে কি করে বলিতে পার?

আকাশ কথা আরও শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ হইল। আলতো করিয়া 😘 চুম্বন করিল একে অপরকে।
অত:পরবেশ কিছুটা সময় এভাবেই অতিক্রান্ত হইয়া গেল।

কোন কেউ একজন বলিয়া উঠিলবাসায় ফিরিবেন না স্যার?
অকস্মাৎ ঘুম ভাঙিল তাহার। সে যে স্বপ্ন দর্শনে মত্ত ছিল।


   🌸----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ২১) 

 

বসন্তের কাছে আর্তি
কলমে - সোমনাথ সিকদার

 

ঋতুরাজ পথ খোঁজে, নিখোঁজ কুহু ডাকে,
শুধু পলাশ আর শিমুল সাজে শাখে শাখে
কোথা গেল দখিনা বাতাস যা সুমধুর বয়?
'বসন্ত এসে গেছে'—ফিসফিস করে বলে কতিপয়
 
শহর আবার সবুজ হবে বসন্ত এলে পরে,
উষ্ণীষ বেঁধে ঋতুরাজ নাচে আনন্দে মন ভরে
মালতী মল্লিকা ফুটবে শাখায়, পান্থকে নেবে চিনে,
দখিনা বাতাসে তিরতির কাঁপে খুশি রিনরিনে
 
এইবারে ভালোবাসা দাও ঋতুরাজ,
মুছে যাক রক্তের দাগ, অলক্তরাগ সাজ
পলাশকে মনে করে স্মার্টফোন ভুলে যাক শহুরে,
কৃষ্ণচূড়ার ফুলে মুহূর্তের মাটি হোক কাজএই প্রহরে
 
আঁধার পেরোতে চাই, অঞ্জলি প্রেম দিয়ে ভরো ঋতুরাজ,
মানুষ স্বজাতি ধ্বংস করে ক্ষমতায় মেতে, ফেলে সব লাজ
ধর্ম, রাজনীতি, রঙ-জাতি নিয়ে পৃথক হলেই সায় দেয় হত্যাতে,
যার হাতে বন্দুক, তার আছে খুনের কারণরোজ রাতে কি প্রভাতে
 
লাল ছাড়া রঙ নেই, বেকসুর লাশ ছাড়া দেশ নেই কোনো,
বাকি সব ঋতুগুলো এক-মনা, বড়ই একরোখা শোনো
গ্রীষ্ম গরম আনে, শীত ঠান্ডাকে, বর্ষা বৃষ্টি ছাড়া কিছুই বোঝে না,
বাকি দুইও নিজেদের পেরিয়ে অন্য কোনো আলো খোঁজে না
 
শুধু তুমি, শুধু তুমি বসন্ত, গাছেদের গায়ে এঁকে রঙ-আলপনা,
বলে দাও মেদুর বেহাগে—‘কোনো প্রেমে আমি না বলবো না
সাদা আর কালো দেখা চশমাতে আমরা স্বপ্নগুলো গুলিয়ে ফেলেছি,
তুমিই তো জানো, ধূসর পেরিয়ে কতবার সাতরঙা পাখনা মেলেছি
 
মানুষকে রঙ দাও আরো একবার, ঋতুরাজ বসন্ত,
পলাশের ডাক দাও, বলো এই বিবর্ণতা নয় অনন্ত
ভালোবাসা হিংসাকে বলে দিক আরো একবার
দ্যাখ তুই কত বড় ভিতু, আমিই চিরন্তন, আমিই সবার


 🌸---------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ২২)

শুভদৃষ্টি
কলমে - জয়নারায়ণ কোলে


আজি বসন্ত সমাগমে
      হৃদয়ে লাগিলো দোলা,
মনের হরষে, প্রেমের পরশে
     রাখিনু দখিন দুয়ার খোলা
 
মনের জানালা ধরে
     ঢুকিলো প্রেমের হাওয়া,
রঙিন বসন্তে উড়িলো আবির
     ভরিলো মনপ্রাণ আর কায়া
 
পথঘাট, হৃদয়, প্রান্তর
     পড়িলো ফুলেতে ঢাকা,
পলাশে,শিমুলে,কৃষ্ণচূড়ায়, অশোকে
  হলো একাকার, কুহুরব ডাকা
 
ফাগের দোলায় দুলিলো
      হৃদয় পড়িলো বাঁধা,
প্রেমের বারতায় মন উচ্চলিত
     ফুলে ফুলে মাল্য গাঁথা
 
আবির রাঙা চন্দ্রবদনে
     দাঁড়ালে তুমি এসে,
হেরিণু তোমার রূপের শোভা
     মনপ্রাণ সব গেলো ভেসে
 
মনকেমনের বসন্ত উৎসব
     হলো যতেক পুষ্পবৃষ্টি,
ফাগ, রঙ, আবিরের খেলায়
তোমার আমার নয়নের শুভদৃষ্টি


  🌸-----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

ক্রমিক নং- ২৩

ফাগুনের চিঠি
কলমে - রতন দাস

সে প্রায় বছর কুড়ি আগের কথা। 

তখন আমি কলেজে পড়তাম। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম বিজ্ঞান বিভাগে। সেই কলেজেই এক ছাত্রী গার্গী আমার বসার বেঞ্চে আমার পাশে বসত। প্রতিদিনই আমার খাতা দেখে লিখতো। রসায়ন বিভাগের প্র্যাকটিক্যাল যখন ল্যাবরেটরিতে হতো, সে আমার সাহায্য চাইত। 

শুধু তাই নয় আমি যখন বাড়ি থেকে কলেজে সাইকেলে আসতাম সে আমার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত। প্রায় প্রতিদিনই আমার সাইকেলে চড়ে আসতে শুরু করে। এমনকি কলেজ শেষ হবার পরও দাঁড়িয়ে থাকত, আমার সাইকেলে যাবে বলে। সে বছর  কলেজে বসন্ত উৎসব হয়েছিল। আমি পাঞ্জাবি প্যান্ট পড়ে গিয়েছিলাম। আর খুব সুন্দর হলুদ রঙের শাড়ি পড়ে সেজেগুজে এসেছিল। 

বসন্ত উৎসবে সবাই একসাথে আবির খেলছিলাম হঠাৎ গার্গী ছুটে এসে আমার গালে আবির দিয়ে লাজুক হাসি হেসে আমার হাতে একটি নীল খামে মোড়া চিঠি দিয়ে গেল 

আমি বললাম, কি এটা 

বলল, খুলেই দেখো।  

আমি আড়ালে গাছের তলায় নীল খামে মোড়া চিঠিটি খুলে দেখলাম 
ওই চিঠিতে লেখা ছিল এরকম...

" তোমাকে আমার ভালো লাগে। 
তোমার ব্যবহার আমার মন কেড়েছে। 
তুমি আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছো। 
তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি। 
তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই। 
আজ বসন্তের রঙে রাঙিয়ে তোমায় প্রেম নিবেদন করছি। 
তুমি সারাজীবন আমার ভালোবাসার মানুষ হিসেবে থাকবে। 
আমি তোমাকে স্বপ্নের রাজকুমার ভাবি। 
আশা করি তুমি আমার মনের ভাষা বুঝতে পারবে। 

ইতি - 
"তোমার গার্গী" 

আমার বুঝতে বাকি রইল না যে এইভাবে সে আমাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। আমিও তাকে মনে মনে ভালোবাসতাম। সেই বসন্তের  আবির রাঙা চিঠিটি এখনো আমার আলমারিতে সাজানো আছে। সেটা ছিল বসন্তের প্রথম প্রেমের নীল খামের চিঠি। 

তারপর একসঙ্গে সিনেমা দেখেছি, পার্কে বসে গল্প করেছি। সেই রঙীন খামের বসন্তের চিঠি আজো মনে দোলা জাগায়। সেই থেকেই প্রেম চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন বিরহ নেমে আসে। পাহাড়ে গার্গী বাবা মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় সকলে প্রাণ হারায়।  

সেই ব্যাথা আজো মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। আমি প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। বন্ধুদের সান্ত্বনায় কলেজে রসায়ন বিভাগে পড়াশোনা করে আজ আমি শিক্ষক হয়েছি। কিন্তু হৃদয়ে সেই বেদনার স্মৃতি এখনো দগদগে আছে।



🌸----------------------------------------------------------------------------------------------🌸

(ক্রমিক নং- ২৪)

   বসন্ত বাতাসে...
লেখক: আকাশ আহমেদ


বসন্তের হাওয়াটা যেন অন্যরকম হয়।
সে শুধু গায়ে লাগে না - মনে লাগে, হৃদয়ে লাগে, অদৃশ্য কোনো সুরে ভেসে যায় জীবনের সব ক্লান্তি।সেই বসন্তেই প্রথম দেখা হয়েছিল তাদের।

কলেজের পেছনের সেই পুরনো কৃষ্ণচূড়া গাছটা, যেটা প্রতি বছর লাল ফুলে আগুন হয়ে ওঠে- তার নিচেই বসে ছিল নীল। হাতে একটা বই, কিন্তু চোখ ছিল দূরে কোথাও। বইয়ের পাতায় নয়, তার দৃষ্টি যেন হারিয়ে গিয়েছিল অজানা কোনো গল্পে।

ঠিক তখনই হালকা বাতাসে ওড়তে থাকা সাদা ওড়না এসে ছুঁয়ে গেল তার মুখ।
চমকে উঠে তাকাতেই দেখল- একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েটির চোখে এক অদ্ভুত শান্তি, ঠোঁটে হালকা হাসি, আর চুলগুলো বাতাসে এলোমেলো হয়ে আছে।

- “সরি… আমার ওড়নাটা…”
নীল কিছু বলার আগেই মেয়েটি একটু লজ্জা পেয়ে ওড়নাটা ঠিক করে নিল।
নীল শুধু তাকিয়েই রইল।
কিছু মানুষকে প্রথম দেখাতেই মনে হয়- এই তো, অনেকদিনের চেনা।
সেদিন কোনো নাম জানা হয়নি।
কোনো গল্পও শুরু হয়নি।

শুধু বসন্তের হাওয়ায় ভেসে গিয়েছিল এক অদ্ভুত অনুভূতি।
পরের দিন, আবার সেই জায়গায়।
নীল যেন অপেক্ষা করছিল- নিজের অজান্তেই।
আর ঠিকই, সে এল।
আজ তার হাতে একটা খাতা।

- “তুমি এখানে প্রায়ই বসো?”
নীল একটু থেমে বলল,
- “হ্যাঁ… আর তুমি?”
মেয়েটি মুচকি হেসে বলল,
- “আমি কবিতা লিখি… বসন্তে এই জায়গাটা ভালো লাগে।”
নীল অবাক হয়ে তাকাল,
- “তাহলে তো তুমি বসন্তের মানুষ।”
- “আর তুমি?”
-  “আমি… অপেক্ষার মানুষ।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর ধীরে বলল,
- “তাহলে বসন্ত আর অপেক্ষা- একসাথে হলে কেমন হয়?”

সেই প্রথম, তাদের মধ্যে গল্প শুরু হলো।
মেয়েটির নাম ছিল মেহরিন।
আর নীল- একজন সাধারণ ছেলে, যার জীবনটা খুব বেশি রঙিন ছিল না।
কিন্তু মেহরিন আসার পর, সবকিছু বদলে যেতে লাগল।
বিকেলের আকাশ, হাওয়ার শব্দ, গাছের ছায়া- সব যেন নতুন করে কথা বলতে শুরু করল।
তারা একসাথে বসে কবিতা পড়ত, গল্প করত, স্বপ্ন আঁকত।

মেহরিন বলত...

- “জানো, বসন্ত শুধু ফুল ফোটার সময় না… এটা ভালোবাসার ঋতু।”
নীল হেসে বলত,
- “তাহলে আমরা কি বসন্তের মানুষ?”
- “না… আমরা বসন্তের গল্প।”

দিন গড়াতে লাগল।
ভালোবাসা যেন ধীরে ধীরে শিকড় ছড়াতে লাগল তাদের হৃদয়ে।
কিন্তু সব গল্পেই যেমন একটুখানি ভয় থাকে- তাদের গল্পেও ছিল।
একদিন হঠাৎ মেহরিন এল না।
তারপর আরেকদিন…
তারপর পুরো এক সপ্তাহ।
নীলের মনে অজানা এক অস্থিরতা।
সে খুঁজল, খোঁজ নিল- কিন্তু কোথাও মেহরিন নেই।
অবশেষে একদিন, সেই কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে একটা চিঠি পেল।
চিঠিটা খুলতেই হাত কাঁপছিল তার -

"নীল,
যখন তুমি এই চিঠিটা পড়বে, আমি হয়তো অনেক দূরে চলে গেছি।
আমি তোমাকে কিছু বলতে পারিনি- কারণ ভয় ছিল, তুমি হয়তো থেমে যাবে।
আমার জীবনটা খুব ছোট… ডাক্তাররা বলেছে সময় খুব বেশি নেই।
তাই আমি চেয়েছিলাম- শেষ বসন্তটা আমি হাসতে হাসতে কাটাতে।
আর তুমি… তুমি আমাকে সেই হাসিটা দিয়েছো।
জানো, বসন্ত বাতাসে তোমার গন্ধ মিশে থাকে এখন।
যদি কোনোদিন হাওয়াটা একটু অন্যরকম লাগে- ভাববে আমি এসেছি।
ভালো থেকো, অপেক্ষার মানুষ…

- তোমার বসন্ত, মেহরিন”

নীল চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।
চারপাশে বসন্তের হাওয়া বইছে-
কিন্তু আজ সেই হাওয়াটা যেন কাঁদছে।
কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো ঝরে পড়ছে একের পর এক-
ঠিক যেন লাল লাল অশ্রুবিন্দু।
বছর কেটে গেছে।
বসন্ত আসে, বসন্ত যায়।
কিন্তু নীল এখনও সেই জায়গায় যায়।
বসে থাকে, অপেক্ষা করে।
হয়তো কোনোদিন আবার হাওয়াটা ওড়না হয়ে ছুঁয়ে যাবে তার মুখ-
আর সে বুঝবে,
মেহরিন এখনও আছে…
এই বসন্ত বাতাসে। 


🌸--------🌸------------🌸----------🌸----------🌸---------🌸-----------🌸---------🌸

📖 “অগ্নিফাগুন”—


শুধু একটি বই নয়,
এ এক অনুভূতির আগুনে রাঙা বসন্ত।


প্রকাশনায়:
বিক্ষুব্ধ বর্ণ সাহিত্য পরিষদ (ই-বুক বিভাগ)

🌸--------🌸------------🌸----------🌸----------🌸---------🌸-----------🌸---------🌸


📚   সমাপ্ত   📚 



  🌸------------------------------------------------------------------------------------------------🌸 সম্পাদকীয়   অগ্নিফাগুন বসন্ত মানেই ...

জনপ্রিয় পোস্ট