বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬

বিশ্বাসের মসনদ (গল্প) - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা 


সেদিন আকাশটা ঘনকালো মেঘে ঢেকে ছিল, মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই কালবৈশাখীর উদয় হয়ে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিপাত হবে৷ তমাল গুটিকতক পোশাক ব্যাগে ভরে আরশিয়াকে বিদায় দিতে এল। চোখ ভর্তি জল আর বুকে অদম্য সাহস নিয়ে আশার প্রদীপ জ্বেলে চলে গেল....দূর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। দিন, তারিখ, মাস, বছর বা সালকে প্রতীক্ষার ক্যালেণ্ডারে যুক্ত করে ঝুকঝুক করে ছুটে চলা ট্রেনে পাড়ি দিল। বাহ্যিক অবয়ব সাথে গেলেও ভালোবাসার চিরকুট আরশিয়াকে ছিঁড়ে দিল, আর শূন্য প্রেমকক্ষ নিয়ে অচীন পথে আবার ফিরে আসার অভঙ্গুর পণে বাস্তবতার কুহেলিকার অতলে হারিয়ে গেল।
 
তমাল যাওয়ার আগে আরশিয়ার পছন্দের শিউলি চারাটি মাটির ঘরের দক্ষিণ দিকের বাতায়নের পাশে রোপণ করে। বছরের পর বছর ফুলের সুবাস দিতে দিতে গাছটিও আজ ক্লান্ত। নিজের সকল পাতা ঝরিয়ে মাঝে মাঝে গভীর নিশীথে অস্ফুট বাক্যে বলে ওঠে - " ফুল দিতে দিতে আমি আজ বৃদ্ধ হয়ে গেছি, আমাকে একটু মুক্তি দেওয়া হোক। আমি আজ অবসরে যেতে চায়! " গত দু'বছর হল গাছটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, শুধুমাত্র পাড়াগাঁয়ের খড়ি কুড়ানোর বধূর দৃষ্টিপাত হয়নি বিধায় অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া বাকি। কাঁচাপাকা চুলে আরশিয়া উলের সোয়েটার বুনতে বুনতে অত্যন্ত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেও তমালের ভালোবাসার দুর্মূল্য অস্তিত্ব আজ নিশ্চিহ্নের পথে৷ অলিখিত চুক্তিপত্রের জবাবদিহিতা আরশিয়াকে অশনি সংকেতের দুর্গন্ধ কক্ষে কোণঠাসা করতে থাকে৷ 

খড়ের চালে রাখা টিয়াপাখির খাঁচাটি আজ ভগ্নপ্রায়৷ তমালের যাওয়ার কয়েক বছর পর পাখিটির মনঃকষ্টে অক্কা পাওয়ার উপক্রম হয়৷ নিজের জীবনসঙ্গীকে খুঁজে পেয়ে দু'জনের মেলানোর মহৎ উদ্যোগে, আরশিয়া খাঁচার আগল উন্মুক্ত করে দেয়, তারা জীবিত থাকলে হয়ত বড় পরিবার গঠন করে ফেলেছে। বাড়ির পাশের উত্তাল নদীটা আজ সংকীর্ণ, সভ্যতার করাল গ্রাসে দমবন্ধ হওয়ায় কোনোরকমে অন্তিম প্রহর গুনছে। ধূলোময়লা আঁকাবাঁকা মেঠোপথে আজ কংক্রিটের ঢালাই। ঘরের পিছনে থরে থরে পড়ে আছে গত হওয়া বছরের একাধিক ক্যালেণ্ডার। পুষ্টিহীনতায় আরশিয়া চোখে কম দেখতে পায়, চশমার সাহায্যে মানুষ চিনতে হয়। মুখের কিছু দাঁত ইতিমধ্যে সঙ্গ দিতে বিরোধ করে নিজে থেকে পড়ে গেছে। অপেক্ষার অনন্ত প্রহর গুণে চোখের জল শুকিয়ে একদম খটখটে হয়ে গেছে...!
 
সেবছর গাছে প্রচুর মকুল এসেছিল। প্রতিটি শাখায় শাখায় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা একদম থোকায় থোকায় ধরেছিল। সরকারি আধিকারিক হাঠাৎ গাঁয়ের পথে মাইকে ঘোষণা ঘরে, আগামী তিনদিন পর বিশাল ঝড় আসছে, তাই যার যা কিছু আছে সেগুলো নিয়ে যেন সুরক্ষিত জায়গায় পৌঁছায়। আরশিয়ার হারানোর মত অবশিষ্ট তেমন কিছুই ছিল। সম্পদ বলতে মাটির কিছু হাঁড়ি-পাতিল, পুরানো পোশাক আর কয়েকটা আধুলি। তল্পিতল্পা গুছিয়ে বড় রাস্তার পাশে আর কয়েকজনের সাথে অবস্থান নিল। শুনল হাতে মাত্র দু'দিন বাকি। 

পরেরদিন ঘুম ভেঙে আরশিয়া দেখল রাস্তার তেমাথায় বেশ ভিড় হয়েছে, বড় চুলদাড়ি নিয়ে একটা পাগল কাকে যেন খুঁজে চলেছে। নিজের ষাট বসন্তের জমা সুপ্ত আশা আজ এক লহমায় জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মত জেগে উঠে...বিষাদের ভূমিকে ছয়লাপ করে দিল। লোকের ভীড় সরিয়ে চশমা ছাড়াই আরশিয়া দেখল সেই চল্লিশ বসন্ত আগের, তাকে কথা দেওয়া মানুষটি পাগলের মত দ্বারেদ্বারে ঘুরে আবার তার কাছে ফিরে এসেছে। এক দৌড়ে কাছে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের জলে বলল - " তমাল দেখ আমি তোমার আরশু, জানো আজও তোমার জন্য আকাশের তারা গুনি, হারিকেনের আলোয় তোমার ছবির সাথে গল্প করি। তোমাকেই সাতজনমের সঙ্গী মেনেছি তাই অন্য কারো সাথে আর ঘর বাঁধিনি। "

খুকুর কষ্ট.. (কবিতা) - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস 



আনতো বামি দুধের বাটি দাদা পায়েস খাবে,
দাদা যাবে পাঠশালাতে সোনার পদক পাবে।

বামি বলে একটু পায়েস মা গো আমায় দেবে,
বাবা বললেন লোভ কেন মে ভাগ্য দাদার নেবে ?

ছোট্ট বামি শুনেই অবাক দাদার যত্ন চলে,
একটু কাজের ভুল হলে তো চাপড় কথা বলে।

মাছের মুড়ো খাচ্ছে দাদা ফুটছে হাসি মুখে,
ছেলে হলে বামি কিন্তু থাকতো মহা সুখে।

বাবা মায়ের সাথে দোসর  ঠাম্মা দাদু পিসি,
বামির জন্য গালি-গালাজ চলছে দিবা নিশি।

এইতো সেদিন পড়ার পাঠে ভুল করেছে দাদা,
দেখছে বামি চুপটি করে ছুঁড়লো দাদা চাঁদা।

দাদার আঘাত কপাল জুড়ে পড়লো ঝরে রক্ত,
বামি কেন শাস্তি পেল দুপুর ক্ষুধার অক্ত।

পাড়া-পড়শি দেখছে সবাই কেউ বলে না কিছু,
দুর্দশা যে এমন করেই নিচ্ছে খুকুর পিছু।

ঘরের থেকেই সমাজ সৃষ্টি অশিক্ষা তাই ঘরে,
সবার আগে ঘর বদলাও কন্যা ভ্রুণের তরে।

সুস্থ চিন্তা পাল্টে দেবে থাকবে কন্যা ভালো,
কন্যা হল মায়ের জাতি জগৎ করে আলো।

চাঁদের সেলাই করা উৎসব (কবিতা) - রেজাউল করীম

           রেজাউল করীম



ঈদ মুবারাক -
আজ আকাশ যেন নতুন পাঞ্জাবি পরে,
তারার বোতামগুলো ঝলমল করে ওঠে অজস্র নিঃশব্দে।

চাঁদটা- একটু লাজুক দর্জি,
সারারাত অন্ধকারের ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে,
ভোর হলে মানুষের মুখে পরিয়ে দেয় আলো-জামা।

আমার ভেতরেও আজ এক নামাজের মাদুর বিছানো -
সেখানে দুঃখগুলো সিজদায় পড়ে আছে,
ক্ষমার হাত দুটো বাতাসের মতো নরম হয়ে যায়।

তুমি দূরে থেকেও -
আজ কেমন কাছে,
যেন সেমাইয়ের গন্ধে মিশে আছে তোমার অদৃশ্য হাত।

এই উৎসব -
কোনো ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়,
এ এক নরম শব্দ,
যা বুকের ভেতর আলগোছে ডেকে বলে -
“ভালোবাসো, আরও একটু ভালোবাসো।”

ঈদ মুবারাক -
আজ পৃথিবীটা
একটা মিষ্টি শিশুর মতো
হেসে ওঠে সবার ঘরে।

নব স্বপনের জাল! - রকিবুল ইসলাম


রকিবুল ইসলাম


কিছু স্বপ্ন'রা শুধু স্বপ্ন হয়েই থাক।
অথবা পুড়ে খাক হয়ে যাক ভঙ্গের অনলে,
পাছে যদি কভু তা ধৃত না হয়!
কিছু আশা শুধু আশা হয়েই থাক।
অথবা আহত হোক নিরাশার করাল গ্রাসে,
পাছে যদি কভু তা পূরণ না হয়!
কিছু আকাঙ্খা,ইচ্ছার পাখিরা উড়তে ভুলে যাক।
অথবা ছটফট করে মরুক উন্মুক্ত আকাশে উড়তে না পেরে,
পাছে যদি কভু তা শুধু আকঙ্খা,ইচ্ছা হয়েই রয়!
কিছু খেদ,কিছু কষ্টরা অপ্রকাশিতই থাক।
অথবা গুমড়ে কেঁদে মরুক আত্মার অন্তরালে,
পাছে যদি কভু তা দূরীভূত না হয়!
কিছু ব্যথা বেদনারা অব্যক্ত'ই থাক।
অথবা আনমনে এঁকে যাক তার ছবি আমার মানস পটে,
পাছে যদি না তার উপশম হয়!
কিছু হতাশাগ্রস্থ মনন শুধু হা-হুতাশ করেই যাক।
অথবা ডুবে যাক বেলা ভূমির বিস্তীর্ণ বালুচরে,
পাছে যদি সে আশ কভু না মিটে হায়!
কষ্টরা থেকে যায়, রয়ে যায় ব্যথারা,
মরুর বুকে ওঠে ঝড়, নিভে যায় আশার প্রদীপ।
তবে,তবুও কিছু মানস আবার নতুন করে বুনতে চায় নব স্বপনের জাল।

সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০২৬

কবিতা! - রকিবুল ইসলাম


 

 রকিবুল ইসলাম

কবিতা!
কতদিন দেখিনি তোমায়!লিখিনি তোমায়!
ঝরে যাওয়া পত্র পল্লব এখন বেঁচে উঠেছে নিশ্চয়!
নিরব, নিথর, মৌন আবহাওয়ায় অথবা মন খারাপের মেঘলা দিনে লিখতাম তোমায় ওই ঝরা পাতার উপর। 
 
জড় পদার্থ বেচারা শারীরিক ও মনো:কষ্টে কুঁকড়ে যেত আর দুমড়ে মুষড়ে ভেঙে পড়ত মর্মর ধ্বনিতে।
 
আমার কবিতা!
তুমি তো আমার দু:খের উপাখ্যান।
রক্ত মাংসের গড়া মানবী যেখানে ব্যর্থ আমার বেদনার ভার বইতে সেখানে শুকনো পাতার আর কি দোষ দিই বলতো?
 
কবিতা! ও কবিতা! ও আমার আত্মার আকুতি!
সিদ্ধান্ত নিলাম শুকনো পাতার কষ্টের কারণ না হয়ে আমার মানস পটের ক্যানভাসে হৃদয়ের তুলিতে রক্তের কালি দিয়ে লিখব তোমায়।
 
কবিতা!
আজ যখন বৃষ্টি নামল,দেখলাম: একগুচ্ছ শুভ্র মেঘের দল একসাথে জমাট বেঁধে ঘন গাঢ় হয়ে কালো বর্ণ ধারণ করেছে,কাঁদছে অঝোর ধারায় আর সংহতি জানাচ্ছে আমার সাথে।
 
কবিতা! ও আমার আত্মার ব্যাকুলতা! ও আমার হৃদয়ের ক্রন্দন!
হারাতে দেব না কভু তোমায়,
রেখে দেবো আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে অথবা হৃদয় ভূমির মানস পটের অন্তরালে।
পড়লে মনে পড়ব তোমায় প্রভাত সাঁঝে।
 
কবিতা!
একদিন তোমায় ছুটি দিয়ে ভাসিয়ে দেব আশার পালকে মেঘের ভেলায়।
পথ চলতে চলতে তখন তোমার যদি আমার তরে একটু মন খারাপের আবহ তৈরি হয়!
 
প্রবল অভিমান মেশানো কান্নার গীত গেয়ে রিমঝিম রবে বারি হয়ে নেমে এসো ধরায়!
হিমশীতল সেই বর্ষা গায়ে মেখে জুড়াবে আমার তপ্ত বক্ষ,অতৃপ্ত আত্মা।
 
কবিতা!
অতঃপর,হয়ত একদিন আমারও মিলবে ছুটি!
আমিও তখন ওপারে গিয়ে মিলব তোমার সাথে।
হয়ত তখন লেখা হবে না নতুন কোন দুঃখের কবিতা।
সুখের সাগরে ভেসে যেতে যেতে লিখব মোরা শুধুই সুখের কবিতা।

শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

খেয়াপার... - সালাম মালিতা


সালাম মালিতা 


বিচিত্র এই জীবন বন্দরে,কষ্টের নোনাজল 
যখন-তখন আছড়ে পড়ে! 

ভয় হয়... 

তূল্যমূল্য বিষাদের দিনলিপি অদৃশ্য ব্যথার কলমে
স্বয়ং আমাকেই লিখতে হয়।

কষ্ট হয় তখন...ভীষণ কষ্ট লাগে..! 

মন খারাপের কথাগুলো একদিন সময় করে 
আমার সাগরের কাছেই জমা করি,
কাউকে ফেরায় না বলে মনসমুদ্রটা
কষ্টের পাহাড় গলা সব জল ধারণ করে নেয়,
তারপর থেকে আমাকেই পুরোটা বহন করতে হয়।

ভীষণ ক্লান্ত...

প্রিয় মানুষের আকস্মিক পরিবর্তনের জলোচ্ছ্বাস 
সমুদ্র ঝড় উদয় করে প্রেমের তরীটাকে-
নিমিষেই লণ্ডভণ্ড করে দেয়!
তাই অকূল দরিয়ায় আশার কাঁচামালগুলো ডুবে
একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। 

বড্ড নিরুপায় আমি...

বাস্তবতার এই বিশাল সাগরে আমি যেন
দিশাহীন এক নাবিক,
যে নিজের সকল অতীতের সম্পদ হারিয়ে আজ
নোঙর ফেলতে ভয় পায়।
তথাকথিত ঘনিষ্ঠের কটুক্তি, জলদস্যুর মত 
সাহসের ডাকাতি করে,
আর ডুবন্ত জাহাজের অন্তিম পিদিম নিভিয়ে দিয়ে 
সম্পূর্ণ গ্রাস করতে চায়।

বড়ই স্বার্থপর....

বিশ্বস্ত এক সঙ্গীর মজবুত বৈঠার আশায় আছি 
যে আমাকে কষ্টের সাগর পাড়ি দিতে
মসীহ হবে!
শুধুই আমার হয়ে সুখে-দুঃখে অপরিবর্তিত থেকে 
জীবনযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হয়ে থাকবে, 
রণতরীটাকে টগবগিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে 
সগৌরবে আমার খেয়াপার করবে,
আর চিরতরের জন্য বিজয় সুনিশ্চিত করতে 
বিজয় পতাকাটি উত্তোলন করবে।

বড় সাধ জাগে...!!

বিশ্বাসের মসনদ (গল্প) - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা  সেদিন আকাশটা ঘনকালো মেঘে ঢেকে ছিল, মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই কালবৈশাখীর উদয় হয়ে বজ্রবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিপাত হবে৷ তমাল গুটিকতক ...

জনপ্রিয় পোস্ট