বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬

আমি একটা গল্প... কলমে -সন্দীপ সাঁতরা




চা খাবে? আজ একটু আগেই বসেছি
অবাক! কাজ ফেলে বসা তোমার স্বভাবে নেই তো।
আজ মে দিবস, তাই নিজেকেই একটু সময় দিলাম।
নিজের সাথে কথা বলছো?
হ্যাঁ, সারাদিন তো অন্যের স্বপ্ন গড়ি।
নিজের স্বপ্ন কেমন?
ধুলোমাখা, তবু ভাঙেনি এখনো।
ক্লান্তি লাগে না?
লাগে, কিন্তু থামলে যেন হার মেনে নেওয়া হয়।
কেউ কি শোনে তোমার কথা?
আজ তুমি শুনছো, এটুকুই বড় কথা।
 তাহলে আজকের দিনটা কেমন লাগছে?
 মনে হচ্ছে, আমি শুধু শ্রমিক নই....
আমি একটা গল্প।


লেখক -সন্দীপ সাঁতরা


রবিঠাকুর... - রেজাউল করীম

 



তুমি কি সত্যিই মানুষ ছিলে, রবিঠাকুর?
নাকি জোড়াসাঁকোর উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা
একটা বিশাল বটগাছ—
যার শিকড়ে ঝুলে থাকত
বাংলা ভাষার সমস্ত দুপুর।

আমি যখন খুব ক্লান্ত হই,
দেখি—
মানুষেরা ছেঁড়া পোস্টারের মতো
নিজেদের মুখ বদলায়।

শুধু তুমি
পুরোনো রেডিওর ভিতর থেকে
বৃষ্টির শব্দ হয়ে ভেসে আসো।

তোমার দাঁড়িতে নিশ্চয়ই লুকিয়ে ছিল
শীতের সকালের কুয়াশা,
নইলে এত শান্তি কোথা থেকে এলো?

এখন চারদিকে শুধু
অ্যালুমিনিয়ামের শব্দ,
কাঁচের ভিতরে আটকে থাকা নিঃসঙ্গতা,
আর বিজ্ঞাপনের নীল দাঁত।
তুমি যখন লিখেছিলে—
মানুষের ভিতরেই ঈশ্বরের বাস,
হয়তো কোনো ভাঙা নৌকার মাঝি
দূরে বসে কাঁদছিল।

তুমি সেই কান্নাকে
শঙ্খের ভিতর পুরে
গান বানিয়ে দিলে।
আমরা এখন গান ভুলে গেছি, রবিঠাকুর।

এখনকার প্রেম
মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে থাকা
অর্ধেক চাঁদ।

এখনকার মানুষ
নিজের ছায়াকেও সন্দেহ করে।
তবু মাঝরাতে
কারা যেন তোমার কবিতার জানালায় এসে
ধূপকাঠির মতো জ্বলে ওঠে।

আজও গ্রামের বুড়ি ঠাকুমারা
ধান শুকোতে শুকোতে
অজান্তেই তোমার সুর গেয়ে ওঠেন।
তোমার নাম যেন
একটা গোপন নদী—
যার জল কেউ চোখে দেখে না,
তবু তৃষ্ণা পেলে
সবাই সেখানে যায়।

তোমাকে আমি কখনো শুধু কবি ভাবিনি।
তুমি বরং একটা বিশাল রেলস্টেশন,
যেখানে দুঃখ এসে বসে থাকে
শেষ ট্রেন মিস করা যাত্রীর মতো।

আর আনন্দ—
তোমার পকেটে রাখা
একটা লাল কাঁচের মার্বেল।
এখন সভ্যতা
নিজের শরীর নিজেই খেয়ে ফেলছে।
বাচ্চাদের চোখে আর জোনাকি নেই,
আছে অনলাইন ক্লাসের ক্লান্ত আলো।

মাঠগুলো ধীরে ধীরে
সিমেন্টের জ্বর হয়ে যাচ্ছে।
তখন তোমার কথা খুব মনে পড়ে।

মনে হয়—
কেউ যদি আবার শালবনের ভিতর দাঁড়িয়ে বলত,
“মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।”
কেউ যদি আবার
পৃথিবীর কপালে হাত রেখে
জ্বর মাপত ভালোবাসার।

রবিঠাকুর,
তুমি কি এখনও
শান্তিনিকেতনের কোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে
চুপচাপ বসে আছো?

তোমার চারপাশে উড়ছে হলুদ পাতা,
আর দূরে কোনো বালক
খাতার শেষ পাতায় লিখছে—
“বাংলা ভাষা মানে
একটা জানালা,
যেখানে দাঁড়ালে আজও
রবীন্দ্রনাথের বাতাস এসে লাগে।”



লেখক - রেজাউল করীম 


মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬

মা — একটা না-বলা বিদায় ।। কলমে - সেখ মঈনুল হক

 
লেখক - সেখ মঈনুল হক 



মা —
তোমাকে ডাকার মতো সহজ শব্দ পৃথিবীতে আর নেই,
তবুও সবচেয়ে কঠিন এই একটাই ডাক —
যখন তুমি সামনে থাকো না …

আমি এখনো মাঝে মাঝে চুপ করে বসে থাকি,
ভাবি —
হঠাৎ যদি তুমি এসে বলো,
“কি রে, এত চুপচাপ কেন ?”
আমি হয়তো হেসে বলবো —
“কিছু না …”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়বো
তোমার সেই একটুখানি স্নেহের ছোঁয়ায়।

মা —
তোমার আলমারিটা এখনো ঠিক আগের মতোই আছে,
শাড়ির ভাঁজে লেগে আছে তোমার গন্ধ,
আমি মাঝে মাঝে ওগুলোতে মুখ লুকিয়ে কাঁদি —
কেউ দেখে না, কেউ জানে না,
শুধু তোমার স্মৃতিটা নীরবে আমার পাশে বসে থাকে।

তুমি জানো মা,
এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করে না —
“খেয়েছিস ?”
এই ছোট্ট প্রশ্নটার অভাব
একটা বিশাল শূন্যতার মতো
আমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়।

আমি অসুস্থ হলে
এখন আর কেউ কপালে হাত রাখে না,
কেউ বলে না — “চিন্তা করিস না, আমি আছি।”
তখন বুঝি —
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটা
আসলে ছিল তোমার কোলে।

মা —
আমি বড় হয়ে গেছি,
কিন্তু তোমাকে হারানোর মতো বড়
কখনোই হতে পারিনি।

তোমার সাথে শেষ কথা বলার দিনটা
এখনো বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে আছে —
আমি তাড়াহুড়োয় ছিলাম,
তুমি হয়তো আরও একটু কথা বলতে চেয়েছিলে …
আমি বলেছিলাম — “পরে কথা বলবো …”
সেই “পরে” আর কোনোদিন আসেনি মা …

আজ যখন রাত গভীর হয়,
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি —
ভাবি,
তুমি কি কোনো তারা হয়ে
আমার দিকে তাকিয়ে আছো ?

মা —
যদি পারো,
একবার স্বপ্নে এসো —
একবার শুধু বলো — “আমি ভালো আছি …”
আমি আর কিছু চাইবো না …

কারণ,
তোমাকে ছাড়া এই পৃথিবীটা
একটা ভিড়ভরা একাকীত্ব —
যেখানে হাজার মানুষ থাকলেও
একটা “মা”র অভাব
সবকিছুকে শূন্য করে দেয়।

শেষে শুধু একটা কথা —
আমি এখনো তোমাকে ডাকি…
নিঃশব্দে, অশ্রুতে, একাকীত্বে—
“মা …”

কিন্তু সেই ডাকের উত্তর
আর কোনোদিন ফিরে আসে না …

স্রষ্টার মুর্তি ... - উজ্জ্বল কান্তি দাশ

 
লেখক - উজ্জ্বল কান্তি দাশ


সবিনয় নিবেদন বলিনি কখনো
প্রার্থনা করিনি যার কাছে অনুমতি, 
সে'ই তো আমার গর্ভধারিণী, 
স্রষ্টার প্রকৃত মুর্তি। 
হাজারো ব্যথায় চোখ মুদে যখন
দেখি আমার মায়ের মুখ, 
বুক হতে সরে,কষ্টের পাথর
দূর হয়ে যায় সকল দুখ। 
নিজের দুঃখ আড়াল করে
হাসতে পারে ক'জন? 
সে কেবলই মা,মায়ের মতো জগৎ মাঝে
আছে বলো আর কোন্ জন?
মায়ের ত্যাগ ভালোবাসার ঋণ
শোধ কি কখনো হবে? 
মায়ের জন্য প্রাণ বাজি রাখো
চির অক্ষয় হবে তবে। 
সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে
কত মা'ই তো হারায় প্রাণ, 
কোটি জনমেও পারবে কি দিতে
সেই মায়ের প্রতিদান? 
সন্তানেরে লালন পালনে
আসে না মায়ের ক্লান্তি, 
সন্তানের সুখ দেখেই মায়ের
মনে লাগে বড় শান্তি। 
মা আছে তাই এত সুন্দর
আনন্দময় বিশ্ব, 
মা না থাকলে ধু ধু হাহাকার
সব থেকেও নিঃস্ব। 
মা'ই সবার পরম আরাধ্য
মা'ই হলো স্রষ্টা, 
মা'ই সবার প্রথম গুরু
জীবন পথের দ্রষ্টা। 
মা ডাকে যে শক্তি সুধা
ডাকো বারংবার, 
মা হারালে ঝাড়বাতিতেও
জীবন অন্ধকার। 
মা জগতের সত্যিকারের
অমূল্য এক রত্ন, 
সময় থাকতে নিজের মায়ের
করিস'রে ভাই যত্ন।

আগামী দিনের কথা ভেবে - শিশির হুদা

 


আগামী দিনের কথা ভেবে আজ 
বুনি আশার বীজ, 
অতীতের সব ধূসর স্মৃতি 
হোক না আজ মিস।

ফেলে আসা পথে পড়ে থাক 
যত ব্যর্থতা আর গ্লানি, 
আগামী আসুক নিয়ে এক 
নতুন ভোরের হাতছানি।

হয়তো সে পথে থাকবে না 
কোনো জীর্ণতার হাহাকার, 
ভেঙে যাবে সব নিস্তব্ধতা
ঘুচবে অন্ধকার।

 মানুষের সাথে মানুষের
 হবে নতুন সেতুবন্ধ, 
বাতাসে ভাসবে ভ্রাতৃত্ব
 আর ভালোবাসার গন্ধ।

শ্রমের ঘামে সিক্ত মাটি 
সোনা ফালাবে কাল, 
শক্ত হাতে ধরব
 মোরা ভবিষ্যতের হাল। 

আজকের এই লড়াই যত
কালকের জয়গান—
 আগামী দিনের তরেই 
হোক আমাদের অভিযান।

স্বপ্নগুলো ডানা মেলুক 
নীল আকাশের গায়, 
ভয়কে জয় করে যেন
 চলা যায় মহিমায়। 

আগামীকাল হাসবে আবার
 স্নিগ্ধ শুভ্র হাসি, 
সেই সুদিনের প্রতীক্ষাতে 
আমি আজো ভালোবাসি।


লেখক -শিশির হুদা 


গল্প : ভাঙ্গা সাইকেল... কলমে- সুবর্ণা দাশ

 


শোভাদেবী বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রোজ পাশের বাড়ির ভদ্রলোক দিবাকর বাবুর চালচলন খেয়াল করেন। আর ভাবেন কি অদ্ভুত জীবন মানুষের। দিবাকর বাবুর দোতলা বাড়ি, দু'খানা গাড়ি, কি নেই ? সব আছে কিন্তু নিজের নয়, আবার ধরতে গেলে নিজেরও বলা যায়। 

কেননা এই গাড়ি, বাড়ি' তো তার ছেলেদের। ছেলের মানে'তো তার নিজের তাই না? কিন্তু এতে সাচ্ছন্দ বোধ করতে পারেন না দিবাকর বাবু, কেমন জানি একটা হীনমন্যতা কাজ করে। এই বাড়ি গাড়ি তার নিজের বলতে কোথায় যেন বাধে তার হৃদয়ে। কারণ এতো তার নিজের রোজগারের নয়, ছেলেদের। 

দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেন দিবাকর বাবু। 

এসব দেখে শোভাদেবীর মনে পড়ে অনেক বছর আগের সেই দিবাকর বাবুকে। যাকে তার কোন এক দাদা তাঁর ব্যবহৃত একটা সাইকেল দিয়ে বলেছিলেন -

"ধর দিবাকর এই সাইকেলটা আজ থেকে তোর। তুই এটা নিয়ে যা খুশি করতে পারিস। তোর প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারিস। এটার মালিক এখন তুই।"

খুশি মনে দিবাকর বাবু সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরেন। 
বউকে এসে বলে দেখ রমেন'দা এই ভাঙ্গাচোরা সাইকেল খানা আমাকে দিল। 
রমেন'দার এত টাকা, প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও আমাকে একটা পুরনো সাইকেল দিল! 

বউ দিবাকর বাবুকে বলে  -

"তুমি কেন এত রাগ করছ? হোকনা পুরনো, তবুও তো রমেন'দা দিলেন! তোমার মতো তুমি ব্যবহার করার জন্য। 

পরেরদিন থেকে দিবাকর বাবু সাইকেলে করে দোকানে যেতেন, হাটবাজার করতেন। দিবাকরের একটা কি যেন ব্যবসা ছিল, মানুষের বাড়ি গিয়ে জিনিস পৌঁছে দেওয়া, সব এই সাইকেলে চড়ে করতেন। কিন্তু সবাইকে বলে বেড়াতেন -

- ঐ বড়লোক দাদা তাঁর এত টাকা তবুও এই ভাঙ্গাচোরা একটা সাইকেল আমাকে দিল! 

শোভাদেবী সে দিনও মনে মনে হেসে ছিলেন, আজও তিনি হাসছেন দিবাকর বাবুর এই অজ্ঞতা, এই অদ্ভুত কান্ড দেখে! 

সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল দিবাকর বাবুর, একটু লং ড্রাইভে যাবে, কিন্তু সংকোচের কারণে কিছুতেই ছেলেদের বলতে পারলেন না ,মনের এই ছোট্ট আকাঙ্ক্ষার কথা। 

আজ মনে মনে রমেন'দার কথা ভাবে, পুরনো হলেও সেই সাইকেলটির সম্পূর্ণ মালিক ছিলাম আমি।নির্দ্বিধায় যেখনে খুশি, যখন খুশি সাইকেলে চড়ে বেড়িয়ে যেতে পারতাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করেন দিবাকর বাবু।

বেলকনি থেকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন শোভাদেবী। 

কি আজব মানুষের মন! 
কি বিচিত্র এই জীবন! 
সব আছে কিন্তু নিজের বলতে কিছুই নেই!


লেখিকা - সুবর্ণা দাশ


আমি একটা গল্প... কলমে -সন্দীপ সাঁতরা

চা খাবে? আজ একটু আগেই বসেছি অবাক! কাজ ফেলে বসা তোমার স্বভাবে নেই তো। আজ মে দিবস, তাই নিজেকেই একটু সময় দিলাম। নিজের সাথে কথা বলছো? হ্যাঁ, সা...

জনপ্রিয় পোস্ট