শনিবার, ২ মে, ২০২৬

কাপুরষ... - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা 

 

অন্ধ পুরুষ স্বপ্ন দেখে
করতে সুখের ঘর,
পঙ্গুর বউটা স্বামীর আদেশ 
রাখে মাথার পর।

সভ্য বলে ডিগ্রি দেখায়
চুড়ি বিহীন হাত,
উলঙ্গ স্ত্রীর লেংটা ভিউজে 
খাচ্ছে গরম ভাত।

এরা নাকি শিক্ষিত সব
সম্ভ্রম বেচে রোজ,
স্তন দেখিয়ে পয়সা কামাই 
হারাম করছে ভোজ।

পতিতা-দের লজ্জা থাকে 
রাস্তায় ভদ্র হয়,
বউ ব্যবসায়ী পথের পরে
বউকে কিনতে কয়।

হিজড়া শুধু লিঙ্গের হয় না 
অর্থে তৈরি আজ,
বৌমা, মেয়ে, বৌ, নাতিনি 
ব্যবসায় নেইকো লাজ!

খদ্দের খোঁজে দুর্বল স্বামী 
যাদের আছে কাম,
চোখের খিদে মেটায় তাদের 
নিয়ে কতক দাম। 

পুরুষ নামের কলঙ্ক সব
বিকলাঙ্গ মন,
বিবেক বেচে পুরুষত্ব
নষ্ট প্রতি ক্ষণ।

নোংরা ছড়ায় অনলাইনে 
কাপুরুষের দল,
রাতে দিনে যোনি দেখায়
সমাজ নষ্টের ছল!

উচ্ছেদ করি লোভী কীটদের
রক্ষায় যুবক কুল, 
শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিই
ফোটাই জ্ঞানের ফুল।

সভ্যতার কারিগর কলমে- ঝরনা দত্ত

ঝরনা দত্ত 




 শ্রমিকরা কাজ করে চলে 
 সভ্যতার কারিগর রূপে,
 দাঁড় টেনে, খেয়া বেয়ে চলে -
 স্তরে স্তরে ক্ষেপে ক্ষেপে।

 শ্রমের বিনিময়ে তৈরি প্রাসাদ,
 অট্টালিকা-মঠ-মন্দির যতো,
 তাজমহল থেকে কুতুবমিনারও
 শ্রমিক গড়েছে মনের মতো।

 সভ্যতার চাকা চলছে সদাই 
 শ্রমিকের অবদানে,
 সভ্য মানুষ সবাই তো বোঝে 
 প্রকৃত শ্রমের মানে।

 ঘরবাড়ি আর কারখানা সব 
 রয়েছে যা দেশ জুড়ে,
 জানো কি এসব শ্রমিকের দান
 তবু শ্রমিক এখনো ভবঘুরে!

 মুখের অন্ন এরাই যোগায় 
 রোদে জলে চাষ করে,
 ধনী বিলাসী বসে থাকে সদা 
 আরামে নিজের ঘরে।

 যানবাহনের নতুনত্বে দেখো 
 শ্রমিকের আছে রক্ত,
 ফোঁটা ফোঁটা রক্তে উঠেছে গড়ে
 যা ছিল বড়োই শক্ত।

 সেই শ্রমিকের ক্ষুধার অন্ন
 বলতো জোগাবে কারা?
 শ্রমের ফল ভোগ করে যারা  
 হাত বাড়াবে কি তারা?

 শ্রমিকের শ্রম  অকৃপণ দান 
 উন্নয়নের প্রতিটি কাজে‌,
 শ্রমিকের কথা সবার কলমে 
 যেনো অবদান হয়ে রাজে।

 দেশের হাল ধরে আছে যারা 
 তারাই তো শ্রমিক দল,
 সব সভ্যতার কারিগর এরা
 এরা বিশুদ্ধ পরিমল।

অঙ্গীকার... - উজ্জ্বল কান্তি দাশ

উজ্জ্বল কান্তি দাশ

 


আঁধারে আমারে একাকী রেখে
যেও না গো কভু দূরে, 
আমি তো বধূয়া সুর বেঁধেছি
তোমারই দেওয়া সুরে। 

পাশে থেকে মোর জীবন পথে
জ্বালিয়ে দিও গো আলো, 
আমি তো কেবলই তোমারে জেনেছি
তোমারেই বেসেছি ভালো। 

দুচোখ বুজে দুচোখ মেলেই
তোমারে দেখিতে পাই! 
মাঝে মাঝে পেতে চাই না তোমারে
চিরদিনই কাছে চাই। 

সুখের দিনে বা দুখের রাতে
তুমিই কেবল গতি, 
মন প্রাণ ধন সবই তো আমার
সঁপেছি তোমারই প্রতি। 

ঝড়ে বা তুফানে কিংবা রোদেলায়
হাতটি ধরে থেকো, 
তোমার প্রাণের ছায়াতে আমার
প্রাণটারে ঢেকে রেখো। 

তোমার পরশে খুঁজে পাই আমি
জীবনে চলার ছন্দ, 
তুমি না থাকলে হৃদযন্ত্র
চিরতরে হবে বন্ধ। 

তোমার হৃদয়ে আমার প্রবেশ
শত জনমের সাধন, 
অনন্ত কাল অটুট রবে
আমার প্রেমের বাঁধন। 

এ বাঁধন কভু দিও না গো খুলে
করো না অস্বীকার, 
এ মধু রাত হোক দুজনার
এক হবার অঙ্গীকার।

বন্ধু - বই... - সর্বানী দাস

  
সর্বানী দাস


ভয় যেখানে জাপটে ধরে বন্ধু সেথায় বই,
নিত্য নতুন জ্ঞান বাড়াতে বই'কে করো সই।

অন্ধকারে আলোর দিশা বই যে দেখায় পথ,
পাতার ভাঁজে ইচ্ছে কলম মনের ভাষার রথ।

অজানাকে জানার চাবি ভুবন করতে জয়,
স্বপ্ন যেথায় ডানা মেলে  শব্দে ছন্দে রয় ।

মন যখন খুব ক্লান্ত হয়ে খোঁজে শান্তির নীড়,
বই নীরবে এসে তখন শব্দে রাখে ধীর।

কত বিপ্লব-বীরের গাথা ইতিহাস বলে যায়,
বিজ্ঞানের পথ জ্বলে ওঠে  প্রমাণ শুধু চায়।

শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার বইয়ের ভাষা সুর,
বইয়ের পাতায় মুঠো বন্দি সব অদেখা  দূর।

বই'কে তাই বন্ধু করতে কবির কলম চায়,
 লেখাপড়া -পড়ালেখা পাঠক পানে ধায়।

জ্ঞানই শক্তি—এই সত্যে তো জীবন পূর্ণ রয় ,
বই এর পাতায় জীবন সদা সমৃদ্ধময় হয়।

ধুলোর নীরবতা... কলমে: হাসিনা খাতুন

হাসিনা খাতুন



সাজিয়েছি এক তাসের প্রাসাদ অতি যতন করে,
ভেবেছি কি আর পড়বে সে ভেঙে সামান্য এই ঝড়ে?
রঙিন তাসের সারিগুলো সব নিপুণ হাতের কাজ,
মাথার উপরে সাজানো রয়েছে মিথ্যে সুখের তাজ।
একে একে সব বসিয়েছি কার্ড পরম অনুরাগে,
স্বপ্নের ঘোর লেগেছিল চোখে গভীর অনুরাগে।

দখিনা বাতাস হঠাৎ নামলে কাঁপন জাগে ঐ গায়,
ক্ষণিকের এই বসতি যে আজ লুটাতে চাবে ধূলায়।
ভিত্তিবিহীন অহংকারের স্তম্ভ ওঠে যে উঁচুতে,
পারবে না কেউ ধ্বংসের হাত থেকে তাকে বাঁচাতে।
উঁচু নীচু সব সমান হবে একটি ফুঁয়ের টানে,
গর্বের সেই অট্টালিকা হারাবে তাহার মানে।

একটু অবুঝ খেয়াল ছিল আর ছিল কিছু আবেগ,
বুঝিনি তো কেন জমেছিল ঐ ঘন কালো মেঘ।
ইটের বদলে কাগজের এই মিছে দালান কোঠা,
নিজের হাতেই সঁপেছি আমার পথের কাঁটা খোঁচা।
হাসছি যখন ভাবছি তখন সবটা পরম সুখের,
জানিনি যে এর অন্তিমে আছে এক নদী ভরা দুঃখের।

পতন যখন শুরু হবে আর থাকবে না কোনো পথ,
ছুটবে না তো স্বপ্নের সেই সোনার বরণ রথ।
বিছানো রয়েছে চারিপাশে ঐ হরতন রুইতন,
হারিয়ে যাবেই এই মিছে সব বৃথা আয়োজন।
তাসের ঘরেতে কোনোদিনও কি স্থায়ী শান্তি মেলে?
সবটা ফুরায় মিছে মায়া আর মিথ্যে এই খেলে।

জীবন যেন তাসের ঘরই ঠুনকো বড় বেশি,
কখনও তো নেই গাম্ভীর্য আর কখনও শুধুই হাসি।
হারানো দিনের স্মৃতির মাঝে মিলবে তাহার খোঁজ,
নতুন করে ঘর বাঁধিবার ফন্দি আঁটি রোজ।
আগের দিনের ধ্বংসস্তূপে নতুন তাসের সারি,
আবার বুঝি সাজিয়ে তুলি মিথ্যে জমিদারী।

তবুও মানুষ স্বপ্ন সাজায় নেই যে কোনো ডর,
ভেঙে যাবে জেনেও গড়ে তোলে ফের তাসের ঘর।
বালির বাঁধের মতোই অলীক এই দুনিয়ার খেলা,
কাগজে মোড়ানো মিছে মায়া আর শুধু সময়ের মেলা।
পতন জেনেও গড়ার মাঝেই প্রাণের সার্থকতা,
রয়ে যায় শুধু ধুলোর পরে এক বিষণ্ণ নীরবতা।

শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬

নিরব ঘামের গল্প... - আকাশ আহমেদ




ভোর এখনো পুরোপুরি জাগেনি। 

আকাশের পূর্বদিকে হালকা লালচে রেখা, যেন সূর্য উঠবার আগে পৃথিবী একটু লজ্জা পেয়ে থেমে আছে। ঠিক সেই সময়েই উঠে পড়ে রামু। তার অ্যালার্ম লাগে না- অভ্যাসই তাকে জাগিয়ে তোলে। পাশে মাটির মেঝেতে শুয়ে আছে তার দুই সন্তান, আর কোণে অর্ধেক ভাঙা খাটে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে তার স্ত্রী সীতা।

রামু নিঃশব্দে উঠে বসে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ঘরের দিকে- এই ছোট্ট, টিনের ছাউনি দেওয়া ঘরটাই তার সব। তারপর ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে। মুখে পানি দেয়, একটা পুরনো গামছা দিয়ে মুখ মুছে নেয়। 

আজও একটা নতুন দিন- কিন্তু তার কাছে প্রতিটা দিনই যেন একই।

রামু একজন নির্মাণ শ্রমিক। 
শহরের বড় বড় দালানগুলো যেগুলো দেখে মানুষ বিস্মিত হয়, সেগুলোর ভেতরে তার মতো অসংখ্য মানুষের ঘাম মিশে থাকে। কিন্তু সেই ঘামের গল্প কেউ জানতে চায় না।

সকাল ছয়টার আগেই তাকে বের হতে হয়। আজও হলো তার ব্যতিক্রম নয়। সীতা আধো ঘুমের মধ্যে উঠে পড়ে, হাতে গরম চা ধরিয়ে দেয়।

“আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরো,”  আস্তে করে বলে সে।

রামু শুধু মাথা নাড়ে। সে জানে- এই কথার ভেতরে কত আশা লুকিয়ে আছে, আর সেই আশা পূরণ করতে না পারার কষ্টও সে জানে।

কাজের জায়গায় পৌঁছাতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। ভাঙা রাস্তা, ঠাসা বাস, ঠেলাঠেলি- সবকিছু পেরিয়ে যখন সে নির্মাণস্থলে পৌঁছায়, তখন সূর্য পুরোপুরি উঠে গেছে।

সাইটে ঢুকেই শুরু হয় কাজ। ইট তোলা, বালি টানা, সিমেন্ট মেশানো- কোনো কাজই সহজ নয়। মাথার ওপর রোদের তাপ, শরীরে ঘাম, পায়ে ক্লান্তি- সবকিছু মিলিয়ে দিনটা যেন একটা দীর্ঘ যুদ্ধ।

রামু কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে থেমে যায়। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দালানটার দিকে তাকায়। ভাবতে থাকে- একদিন এই দালানে হয়তো বড় বড় মানুষ থাকবে, এয়ারকন্ডিশনের ঠান্ডা হাওয়ায় বসে থাকবে। কিন্তু সে? সে তো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে, রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে।

দুপুরে একটু বিরতি মেলে। একটা শুকনো রুটি আর আলুর তরকারি খায়। পাশে বসে থাকা আরেক শ্রমিক, গোপাল, হঠাৎ বলে ওঠে -

“ভাই, এত কষ্ট করি, তবুও কিছুই বদলায় না কেন?”

রামু একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে -

“আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না, ভাই। আমরা শুধু কাজ করি, আর বাকিরা ফল ভোগ করে।”

দুপুরের পর আবার শুরু হয় কাজ। শরীর তখন আর সায় দিতে চায় না, কিন্তু থামার উপায় নেই। দিন শেষে মজুরি না পেলে ঘরে খাবার উঠবে না।

বিকেলের দিকে হঠাৎ একটা ছোট দুর্ঘটনা ঘটে। একজন শ্রমিক পা পিছলে পড়ে যায়। সবাই ছুটে আসে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার সবাই কাজে ফিরে যায়। কারণ এখানে থামার সুযোগ নেই। কষ্ট, ব্যথা- সবকিছু চাপা দিয়ে কাজ করে যেতে হয়।

রামু এই দৃশ্য দেখে ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। ভাবে- যদি একদিন তার সাথেও এমন কিছু ঘটে? তার পরিবার তখন কী করবে? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।

দিন শেষে যখন কাজ শেষ হয়, তখন শরীর যেন আর নিজের থাকে না। তবুও সে হাঁটে- ধীরে ধীরে, ক্লান্ত পায়ে বাড়ির দিকে।

বাড়ি পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। ঘরে ঢুকতেই দুই সন্তান দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। এই মুহূর্তটাই তার সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

বাবা, তুমি আজ কী এনেছো?” ছোট ছেলেটা জিজ্ঞেস করে।

রামু হাসে। পকেট থেকে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেট বের করে দেয়। ছেলেটার মুখে হাসি ফুটে ওঠে-এই ছোট্ট হাসিই তার দিনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

রাতের খাবার খেতে বসে সীতা জিজ্ঞেস করে -

“আজ কত পেলেন?”
রামু একটু থেমে বলে -
“আজ পুরোটা দেয়নি… বলেছে কাল দেবে।”

সীতার মুখটা একটু ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু সে কিছু বলে না। কারণ সে জানে- এই কথাগুলো বলার মধ্যেই রামুর কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে।

রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে রামু একা বসে থাকে। বাইরে চাঁদের আলো পড়েছে, কিন্তু তার ভেতরে যেন অন্ধকার।

সে ভাবে -
তারও তো স্বপ্ন ছিল। ছোটবেলায় পড়াশোনা করবে, ভালো একটা কাজ করবে। কিন্তু দারিদ্র্য তাকে সেই স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

আজ সে শুধু একজন শ্রমিক- যার নাম নেই, পরিচয় নেই, আছে শুধু পরিশ্রম।

কিন্তু তবুও, তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। প্রতিদিন নতুন করে শুরু করার শক্তি। নিজের কষ্ট ভুলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর শক্তি।

সে জানে - তার গল্প কেউ লিখবে না। তার কষ্ট কেউ বুঝবে না। কিন্তু তবুও সে থামে না।

কারণ সে জানে -
তার থেমে যাওয়া মানেই তার পরিবারের থেমে যাওয়া।

রাত গভীর হয়। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার।
কাল আবার ভোর হবে, আবার শুরু হবে সেই একই লড়াই।
কিন্তু সেই লড়াইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তার ভালোবাসা, দায়িত্ব আর বেঁচে থাকার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

এই হলো একজন মেহনতি শ্রমিকের না বলা গল্প -
যেখানে কষ্ট আছে, বঞ্চনা আছে, তবুও আছে অদম্য জীবনের জেদ।
আর হয়তো একদিন,
এই নীরব ঘামের গল্পগুলোই বদলে দেবে পৃথিবীর ভাষা।

কাপুরষ... - সালাম মালিতা

সালাম মালিতা    অন্ধ পুরুষ স্বপ্ন দেখে করতে সুখের ঘর, পঙ্গুর বউটা স্বামীর আদেশ  রাখে মাথার পর। সভ্য বলে ডিগ্রি দেখায় চুড়ি বিহীন হাত, উলঙ্গ স...

জনপ্রিয় পোস্ট