 |
| জয়দীপ বসু |
প্রাক্ কথনবিপ্লববাদ (Revolutionism) কেবল রক্ত-রঞ্জিত অভ্যুত্থান নয়; এটি একটি ধারাবাহিক চিন্তা-প্রবাহ, যার কেন্দ্রে থাকে পুরোনো শৃঙ্খল ভেঙে নতুন সামাজিক চুক্তি গড়ার ইচ্ছা। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে এই ইচ্ছা কিভাবে প্রকাশ পেয়েছে, কিভাবে সাফল্য, ব্যর্থতা এসেছে এবং বাংলার বিপ্লববাদ প্রসঙ্গে এর প্রতিধ্বনি কি -এগুলো অনুসন্ধান করাই এখানে লক্ষ্য।
ধারণার ভিত্তি : বিপ্লববাদ তিনটি মূল প্রশ্নের ওপর দাঁড়ায়:
1. কে শাসন করে? ( শাসকের বৈধতা সংকট, প্রশ্ন )
2. কাদের জন্য শাসন? (শ্রেণি বা জাতি )
3. কীভাবে পরিবর্তন? (হিংসা বা অহিংসা, দ্রুত বা ধীর)।
এই প্রশ্নগুলো উত্তর দেওয়ার পথে উদারনৈতিকতাবাদ, মার্কসবাদ, জাতীয়তাবাদ, নারীবাদ, মনস্তাত্ত্বিক চিন্তন ইত্যাদি বিভিন্ন আদর্শের জন্ম দেয়; যেগুলো প্রত্যেকটি আলাদা, আলাদা নিজস্ব ‘বিপ্লববাদ’।
প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় রূপরেখা: প্রাচীন গ্ৰীস স্টেসিস বা নগর রাষ্ট্র-- নগর-রাষ্ট্রে ধনী-গরিবের সংঘাত; তবে লক্ষ্য ছিল নীতি-সংশোধন, শাসন-ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো বদল নয়। ইংল্যান্ডের গৌরবময় (১৬৮৮): রক্তপাতহীন, তবে সংবিধানিক রাজতন্ত্রের মাধ্যমে ‘রাজা পার্লামেন্টের অধীন’ ধারণা প্রতিষ্ঠাবিপ্লববাদের শান্তিপূর্ণ মডেল।
আধুনিক বিপ্লবের জন্ম-ত্রয়ী :
1. আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৬): প্রাকৃতিক অধিকার ভিত্তিক, বুর্জোয়া প্রধান। ফল—সংবিধান, ফেডারেল গণতন্ত্র।
2. ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯): সাম্য-ভিত্তিক, জনতা-কেন্দ্রিক; পরে নেপোলিয়নীয় সাম্রাজ্যে রূপান্তর, যা দেখায় বিপ্লব-পরবর্তী ক্ষমতার শোষণ-ঝুঁকি।
3. হাইতিয়ান বিপ্লব (১৭৯১-১৮০৪): প্রথম সফল দাস বিপ্লব; জাতি,দাসত্ব বিলোপের মডেল, তবে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজমান।
আদর্শ-বিপ্লবের শতক (১৯-২০শতক ): - মার্কস-এঙ্গেলস: উৎপাদন-সম্পর্কের বৈপরীত্য থেকে সর্বহারার বিপ্লবের তত্ত্ব।
- রুশ বিপ্লব (১৯১৭): প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; ভূমি জাতীয়করণ, পরিকল্পিত অর্থনীতি, তবে একদলীয় দমন যন্ত্রের জন্ম।
- উপনিবেশ-বিরোধী ঢেউ: ভারত (১৯৪৭), আলজেরিয়া (১৯৬২), ভিয়েতনাম (১৯৭৫)। এখানে জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র মিলে মিশে মুক্তি-বিপ্লবী আদর্শের জন্ম দেয়।
বাংলার ভূখণ্ডে বিপ্লববাদের রূপচিত্র:- সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬০-৭০): প্রাক্-ঔপনিবেশিক কর-বিরোধী, ধর্ম-অর্থনীতির সংমিশ্রণ স্বদেশী ও বিপ্লবী দল (১৯০৫-১৯৩০): অরবিন্দ, সূর্য সেনের সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন; ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদ।
- নকশাল আন্দোলন (১৯৬৭-৭১): চীন-মার্কসবাদী প্রভাব, কৃষক-শ্রমিকের সশস্ত্র সংগ্রাম; মহাশ্বেতা দেবীর 'হাজার চুরাশির মা' তে পরিবারিক বিপ্লবের টানাপোড়েন স্পষ্ট।
- সাহিত্যের প্রতিফলন: মহাশ্বেতা দেবীর আদিবাসী বিপ্লব, নবনীতা দেব সেনের নকশাল প্রেক্ষাপট, হাসান আজিজুল হকের গ্রামীণ বিদ্রোহ—সবই বিপ্লববাদকে মানবিক প্রশ্নে রূপ দেন
বিপ্লববাদের দ্বিমুখী উত্তরাধিকার:
- মুক্তি-দৃষ্টান্ত: দাস প্রথার অবলুপ্তি, নারীর ভোটাধিকার, কল্যাণ রাষ্ট্র।
- দমন-চক্র: ফ্রান্সে রোবসপিয়রের গিলোটিন, স্টালিনের শুদ্ধি অভিযান, রেড গার্ডের বিশৃঙ্খলা দেখায় যে বিপ্লব নিজেই নতুন অভিজাত শ্রেণী তৈরি করতে পারে।
সমকালীন প্রতিধ্বনি আজকের জলবায়ু বিপ্লব, ডিজিটাল গণতন্ত্রের দাবি, বর্ণ-ন্যায়বিচার আন্দোলন সবই একই প্রশ্ন করে, বর্তমান ব্যবস্থা কি ন্যায়সঙ্গত? হিংসা,অহিংসা, সাম্য, অসাম্য, বিশ্বায়নে তার প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে বিতর্ক এখনও চলমান, তবে লক্ষ্য একটাই ক্ষমতার পুনঃবণ্টন। বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সমতার আদর্শ বাস্তবায়িত করা।
শেষ বক্তব্য
ইতিহাসে বিপ্লববাদ কোনো একক ঘটনা নয়, এটি মানবজাতির অবিচার-বিরুদ্ধ অবিরাম অধিকারের প্রশ্ন- প্রতিটি বিপ্লব পুরোনো কাঠামো ভেঙে নতুন সম্ভাবনার ঊষার দুয়ার খুলে দেয়, কিন্তু সফলতা নির্ভর করে বিপ্লব-পরবর্তী প্রতিষ্ঠান-গঠন ও নৈতিক সততার উপর। বাংলার সমাজ, সাহিত্য, অর্থনীতি, রাজনীতিতে এর প্রভাব দেখা যায়।বিপ্লববাদ শুধু রাস্তায় নয়, ঘরে, কলমে, স্মৃতিতে বাস করে এবং তাই ইতিহাসের পাতায় তার পদধ্বনি বারে বারে শোনা যায়। তাই বিপ্লববাদ মানুষের অন্তরাত্মার শোণিত স্পন্দন।