রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬

“লাইভে থাকা জীবন ” - আকাশ আহমেদ


আকাশ আহমেদ


এই সময়টা অদ্ভুত। মানুষ এখন আর শুধু বাঁচে না- সে লাইভে থাকে। ঘুম থেকে ওঠা, কান্না, প্রেম, প্রতিবাদ, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত এখন দর্শকের সামনে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সত্য আর অভিনয়ের মাঝখানে যে ফাঁকটা, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে অনিরুদ্ধ।

অনিরুদ্ধ ঘোষ- তেত্রিশ বছরের যুবক। পেশায় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের কনটেন্ট এডিটর। কিন্তু পরিচয়ের আগে এখন পেশা আসে না, আসে ফলোয়ার সংখ্যা। অনিরুদ্ধর ফেসবুক ফলোয়ার এক লক্ষ ছাড়িয়েছে। টুইটারে সে “ভেরিফায়েড”, ইউটিউবে নিয়মিত লাইভ করে- সমাজ, রাজনীতি, নৈতিকতা নিয়ে।

লোকজন তাকে বলে -
“এই সময়ের সাহসী কণ্ঠ।”
কিন্তু অনিরুদ্ধ জানে, সাহসের চেয়ে বেশি এখানে টাইমিং দরকার।

সকাল ছ’টা। ফোনের স্ক্রিন আলো জ্বলে উঠছে বারবার। নোটিফিকেশন, মেসেজ, ট্রোল, হুমকি- সব একসঙ্গে।

“আজ লাইভ করবে তো?”
“কালকের ভিডিওটা আগুন ছিল ”
“আপনি বিক্রি হয়ে গেছেন।”

একসঙ্গে প্রশংসা আর বিষ - এই সময়ের প্রাত্যহিক খাবার।

বিছানা থেকে উঠে জানলার সামনে দাঁড়ায় অনিরুদ্ধ। বাইরে শহর জেগে উঠছে- মেট্রোর শব্দ, হর্ন, চায়ের দোকানের হাঁক। কিন্তু এই শহরের সবথেকে জোরালো শব্দ এখন মোবাইলের ভেতর।

আজ একটি বড় বিষয়। গত রাতে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে- এক কলেজ ছাত্র পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর আহত। সরকার বলছে, “গুজব।” সোশ্যাল মিডিয়া বলছে, “দমন।”

অনিরুদ্ধ জানে, আজ লাইভ করলে ভিউ বাড়বে। কিন্তু সে জানে না - সে কি সত্য বলবে, নাকি জনপ্রিয় কথা?

এই প্রশ্নটাই এখনকার মূল সংকট।
আগে সাংবাদিকতা ছিল মাঠে নেমে, খোঁজ নিয়ে। এখন সাংবাদিকতা মানে- ট্রেন্ড ধরো, মত বানাও, বিক্রি করো।

তার অফিসে ঢুকতেই বস তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখো অনি, লাইভ করবে ঠিক আছে। কিন্তু ব্যালান্সড থাকতে হবে। আমরা কারও বিরুদ্ধে যাচ্ছি না।”

“কিন্তু ভিডিওটা -”
“ভিডিও অনেক কিছুই দেখায়। আমরা নিশ্চিত নই।”
নিশ্চিত না হওয়া এখন নিরাপত্তা।
অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকে। কারণ সে জানে - এই চাকরি ছাড়া তার বাবার ওষুধ চলবে না।

বাবা - অমলেন্দু ঘোষ। একসময় স্কুল শিক্ষক ছিলেন। এখন স্ট্রোকে আক্রান্ত। কথা বলতে পারেন না ঠিকমতো। কিন্তু চোখে আজও একটা প্রশ্ন -
“তুই ঠিক কাজটা করছিস তো?”
অনিরুদ্ধ সেই চোখের দিকে তাকাতে পারে না।
মা নেই বহু বছর। এই শহর, এই চাকরি, এই লাইভ - সব বাবাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।

রাতে সে লাইভে যায়।

“বন্ধুরা, আজ আমরা কথা বলব গতকালের ঘটনাটা নিয়ে। অনেকেই বলছেন এটা অত্যাচার, আবার অনেকে বলছেন গুজব। আমরা চেষ্টা করব সত্যের কাছাকাছি যেতে।”

লাইভে দর্শক সংখ্যা দশ হাজার ছাড়ায় মিনিট পাঁচেকেই।
কমেন্ট আসছে -
“ভাই, ভয় পেও না।”
“সত্য বলো।”
“টাকা ক’টা নিলে?”

এই সময়ে সত্য বলার চেয়ে কঠিন কাজ আর নেই।
অনিরুদ্ধ ভিডিওটা চালায়। থামিয়ে থামিয়ে বিশ্লেষণ করে। শব্দ বেছে বেছে বলে। কোনো পক্ষেই পুরোপুরি যায় না।

লাইভ শেষে ভিউ রেকর্ড ভাঙে।
কিন্তু রাতে ঘুম আসে না।

পরদিন সকালে একটি ইনবক্স মেসেজ -
“আমি আহত ছেলেটার দিদি। আপনি যদি সত্যিই সত্য জানতে চান, আমাদের বাড়িতে আসুন।”
অনিরুদ্ধ যায়।

এক চিলতে ঘর। বিছানায় শুয়ে আছে ছেলেটা - রাহুল। মাথায় ব্যান্ডেজ। চোখে ভয়।

দিদি বলে,
“দাদা, আমরা কিছু চাই না। শুধু সত্যটা বলুন।”
অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকে। তার মাথায় ঘুরছে - লাইভ, ভিউ, অফিস, বাবার ওষুধ।
রাহুল ধীরে বলে,
“দাদা, আমি কিছু করিনি।”
এই একটা বাক্য অনেক লাইভের চেয়েও ভারী।

সেদিন রাতে অনিরুদ্ধ আবার লাইভে যায়।
কিন্তু আজ স্ক্রিপ্ট নেই।

সে বলে -
“আজ আমি যা বলব, তার জন্য হয়তো কাল আমি চাকরি হারাতে পারি। কিন্তু আজ আমি একজন মানুষ হিসেবে কথা বলব।”

সে সব বলে দেয়। নাম, স্থান, ঘটনার পেছনের সত্য।
লাইভে দর্শক সংখ্যা আকাশছোঁয়া।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ট্রোল, হুমকি, রিপোর্ট।
লাইভ শেষ হওয়ার আগেই ফোন আসে বসের -
“কাল অফিসে আসার দরকার নেই।”

সব শেষ হয়ে গেল?

না।
পরের দিন সংবাদমাধ্যমে আলোচনা। অন্য চ্যানেলও ঘটনা তুলে ধরে। তদন্ত শুরু হয়।
অনিরুদ্ধ বেকার, কিন্তু মাথা উঁচু।
বাবা তার হাত ধরে। কিছু বলতে পারে না। শুধু চোখ ভিজে ওঠে।

কয়েক মাস পর -
অনিরুদ্ধ এখন ছোট একটি স্বাধীন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালায়। ফলোয়ার কম, কিন্তু বিশ্বাসী।
সে এখনো লাইভে যায়। কিন্তু লাইভের আগে মাঠে যায়।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে সে শিখেছে -
লাইভে থাকা আর জীবিত থাকা এক নয়।
কখনো কখনো লাইভ বন্ধ করেই জীবনকে বাঁচাতে হয়।

জানলার বাইরে শহর আবার জেগে ওঠে।
মোবাইলের নোটিফিকেশন বাজে।
অনিরুদ্ধ ফোনটা উল্টে রাখে।
আজ সে একটু দেরিতে লাইভে যাবে।
আজ সে আগে মানুষ।


প্রথম প্রকাশঃ 91.9 friends fm (৫ এপ্রিল ২০২৬)






জাল... - সমর্পিতা রাহা



জগৎ জুড়ে নরম গরম 
  নানা কীটে ভরা,
হাত মেলাতে পারলে ভালো 
নাহলে আধ মরা।
ইচ্ছে মতো থাকি আমি
নিজের জ্ঞানে চলি,
জগৎ জুড়ে নোংরা খেলা
টিপছ গলার নলি।
স্থান কাল পাত্র ওজর বুঝে 
বলো উচিত কথা ,
হঠাৎ করে বোম ফাঁটিয়ে 
দিচ্ছ কেন ব্যথা।
ভুল বুঝে যে কামড় দিলে
   টিটেনাসের জ্বালা,
দুর্ঘটনা ঘটে গেলে
দিচ্ছ তখন মালা।
অভিজ্ঞতা ভীষণ কাঁচা 
   প্রাণটা তুমি নিলে,
অহং বোধে যখন তখন 
আঘাত শুধু দিলে।


সমর্পিতা রাহা 


বৃথা আস্ফালন! - রকিবুল ইসলাম


"মহারাণী!"

আজ অনেকদিন পর কলম ধরলাম তোমাকে নিয়ে তোমাকে কিছু লিখব বলে,নয়ত কিছু বৃথা আস্ফালন হবে। 

তবুও তো লেখা হবে,তা ও আবার তোমাকে! যে তুমি আমার অন্তরাত্নার মাঝে বসবাস করেও আজ  কোথায়,কতদূরে! "মহারাণী!!"আজো আমার নির্ঘুম রজনী কাঁটে তোমায় ভেবে।"মহারাণী!' মল্লিকা'দি''র কথা শুনেছ নিশ্চয়? 

মল্লিকা'দিরা কিন্তু কালজয়ী,।কালে-ভাদ্রে আসে।ঠিক হ্যালির ধূমকেতুর মত। তোমার মত মহিয়সী ললনারাও ঠিক"বেগম রোকেয়া"না হলেও তাদের কাতারের,সেই স্তরের। নিজে রঙ্গীন হয়ে নয়,স্বীয় রঙ্গে অন্যকে রাঙ্গিয়ে রঙ্গীন হও তোমরা।

এতেই তোমাদের চরম পরিতৃপ্তি,পরম পুলক।

এতসব পুলকের সমারোহে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার বদলে দিনশেষে তোমার মুখাবয়বে অতৃপ্তির বলিরেখা সুস্পষ্ট হয়ে উঠে। কি যেন এক অজানা উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় আরো ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে মনটা।একটু একটু করে জমে উঠে বেদনার ভারী কালো মেঘ।একটা সময় আর ভার সইতে না পেরে অক্ষিযুগল নিঃসৃত অশ্রু হয়ে কপল বেয়ে নেমে আসে ফোঁটা ফোঁটা মুক্তবিন্দু।    

কি জানি! কোন আক্ষেপ হয়ত তাড়িয়ে বেড়ায় তোমাকে সারাক্ষণ।  

তোমরা তো অস্পৃশ্য, যাদের বসবাস শুধুমাত্র কল্পনা ও স্বপ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর এই কারণেই তোমার হর্ষ- বিষাদ কিছুই আর অবলোকন করা হয় না আমার।আজন্ম লালিত স্বপ্ন-আকঙ্খা নিয়ে চেয়ে আছি ভবিষ্যপানে- আমি নই,সুখী হও তুমি।পূরণ হোক তোমার সকল স্বপ্ন,আশা- আকাঙ্খা,কল্পনা,কামনা-বাসনা।   

                                                                                                     -তোমার অপছন্দের আমি।


রকিবুল ইসলাম




মলাটহীন ডায়েরির পাতা... (কবিতা) - হাসিনা খাতুন


হাসিনা খাতুন


ম - মনটা আমার ছিল একা,
পাইনি যখন তোমার দেখা।
মলাটহীন এই খাতার ভাঁজে,
শব্দরা তাই একাই সাজে।

লা - লালচে আলোয় বিকেল বেলা,
স্মৃতিরা সব করছে খেলা।
লুকিয়ে রাখা মনের কথা,
মুছিয়ে দেবে বুকের ব্যথা।

ট - টানাপোড়েন সব ঘুচিয়ে,
রাখব তোমায় খুব গুছিয়ে।
টুকরো যত অভিমান সব,
করবে মনেই কলরব।

হী - হীন হয়ে দিন কাটানো,
যায় না তো আর সময় মানো।
হারিয়ে যাওয়া সুখের দিন,
স্বপ্নরা হোক আবার রঙিন।

ন - নীল আকাশে ডানা মেলে,
সবটুকু দুঃখ দেব ফেলে।
নতুন করে বাঁচতে শেখা,
হবে কি তবে আবার দেখা?

ডা - ডায়েরি জুড়ে তোমার কথা,
রইবে না আর কোনোই ব্যথা।
ডাকলে তুমি আসব ফিরে,
তোমার ঐ সুখের ভিড়ে।

য়ে - চেয়ে থাকা সেই পথের পানে,
সব হবে আজ নতুন গানে।
মেঘের মতো ভেসে চলা,
সহজ হবে সব কথা বলা।

রি - রিনরিনে সেই হাসির সুর,
লাগে আমার বড্ড মধুর।
রিদম খুঁজে পাবে গান,
জুড়াবে এবার মনের প্রাণ।

র - রঙিন ঘুড়ির সুতোটা ধরে,
থাকব মোরা আপন ঘরে।
রোজ রাতে এই চাঁদের আলোয়,
কাটবে সময় বড্ড ভালোয়।

পা - পাখি হয়ে উড়তে চাই,
তোমার মাঝে হারানো চাই।
পাথর চাপা মনের কষ্ট,
হবে না আর কোনোই নষ্ট।

তা - তারা ভরা আকাশ পানে,
থাকব সুখে দুজনে মিলে।
তারপরে এই ইতি টানলাম,
নতুন এক পথ চিনে নিলাম।

আমার কান্না... (কবিতা) - সর্বানী দাস

সর্বানী দাস 


নদী তুমি দুহাত বাড়াও আমার কান্না পূর্ণ হোক ,
সকল দুঃখ ভুলতে গেলে ভুলতে হবে মৃত্যু শোক ।
একুল ওকুল ভাসাও তুমি কান্না বুকে নদীর ক্ষয়,
আমার সকল সৃষ্ট আবেগ  জীবন বৃক্ষে গল্প হয়।
সূর্য তবু অস্ত গেলে গোধূলিতে বসবে পাট,
আমি তখন  অপেক্ষাতে প্রদীপ জ্বেলে দেখবো বাট।
ঢেউ ভেঙে ঢেউ গড়বে আবার বলবে কথা মনের মন,
তখন আমার অশ্রু খুঁজে বসবে যত আপন জন।
মায়ের কোলে মুখটি গুঁজে খুশির কান্না ভাঙলো ঢেউ,
তারপরে তো সুখের ক্লেশে এখন পাশে নেই তো কেউ।
আমি শুধু ভাবতে থাকি দন্ড পেলাম কেনো আজ,
সবাই কেমন সুখে কাটায় দুঃখ যামি আমার রাজ।
নদীর কাছে দুঃখ কয়ে হালকা হলাম একটু যেই,
 ঠিক তখনই দেখি পাশে সঙ্গী আমার কেউ তো নেই।
আপন জনে দুঃখ দিলে চলে মরণ খেলার রেশ,
জীবন থাকতে মৃত্যু আপন  কালবেলাতে সময় শেষ।
হে বিধাতা কি অপরাধ শাস্তি দিলে মোরে হায়!
রইছি বসে একলা ঘরে বিনিদ্র রাত কেঁদেই যায়।
 প্রাণের প্রভু নাশ করো হে সকল দুঃখ কষ্ট মোর,
বেঁচে থাকতে বিরহতে নষ্ট জীবন কষ্ট ঘোর।

অসুখী সময়ের ডায়েরি... (কবিতা) - বিধান চন্দ্র সান্যাল

        বিধান চন্দ্র সান্যাল


সেদিন বিকেলে যখন রোদ আর বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা চলছিল,
তখন আমার টেবিলে একটা আস্ত কবিতা এসে বসল।
ডানাভাঙা পাখির মতো, ক্লান্ত, ধূসর।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কি সুখী?"
কবিতাটি মলিন হেসে বলল, "আমি তো সময়ের আয়না,
মানুষের হাসি দেখলে আমি ঝলমল করি,
আর যখন কারো বুকভরা হাহাকার দেখি,
তখন আমিই হয়ে যাই নীল বিষাদের কাব্য ।"
বুঝলাম, কবিতা কোনো নির্দিষ্ট ডেরায় থাকে না।
কখনো প্রেমের জোয়ারে সে সুখী,
কখনো বিচ্ছেদের রিক্ততায় সে ভীষণ দুখী।
সে আসলে সুখ আর দুঃখের মাঝখানের একটা সাঁকো,
যাতে ভর দিয়ে কবিরা পার করে অসীম শূন্যতা ।
সেদিন রাতে যখন তারাগুলো নিভে আসছিল,
কবিতাটি আবার ফিসফিস করে বলল,
"আমার কোনো জাত নেই, আমার কোনো সুখ-দুঃখ নেই,
তোমরা ভালোবাসলে আমি আনন্দ,
ঘৃণা করলে আমিই বেদনা।
আমি শুধু বেঁচে থাকি মানুষের মনের গহীন অরণ্যে

“লাইভে থাকা জীবন ” - আকাশ আহমেদ

আকাশ আহমেদ এই সময়টা অদ্ভুত। মানুষ এখন আর শুধু বাঁচে না- সে লাইভে থাকে। ঘুম থেকে ওঠা, কান্না, প্রেম, প্রতিবাদ, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত এখন দর্শ...

জনপ্রিয় পোস্ট