ভালোবাসাহীন হৃদয়ের দিনলিপি
লেখক - আকাশ আহমেদ
চতুর্থ পর্ব:
নীরবতার কান্না
রাত যত গভীর হয়, মানুষের ভেতরের সত্যগুলো তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দিনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক কিছু ভুলিয়ে রাখে - কাজ, দায়িত্ব, মানুষের ভিড়, ফোনের শব্দ - সব মিলিয়ে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাত ?
রাত কাউকে লুকাতে দেয় না।
রাত মানুষকে তার নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আকাশ এখন প্রতিটা রাতেই নিজের সামনে দাঁড়ায়।
আর প্রতিটা রাতেই সে একটু একটু করে ভেঙে পড়ে।
সেদিন রাতেও সে ঘুমাতে পারেনি।
ঘড়ির কাঁটা তখন প্রায় তিনটা ছুঁইছুঁই।
ঘরের সব আলো নিভানো, শুধু জানালার পাশে রাখা ছোট্ট ল্যাম্পটা জ্বলছে। সেই ম্লান আলোয় আকাশ চুপচাপ বসে ছিল।
বাইরে হালকা বাতাস বইছে।
দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
পুরো শহর ঘুমিয়ে আছে।
কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় চলছে।
সে ধীরে ধীরে ফোনটা হাতে নিল।
কনট্যাক্ট লিস্ট খুলল।
অসংখ্য নাম।
ব্যবসার পার্টনার।
কর্মচারী।
সংগঠনের মানুষ।
পরিচিত।
বন্ধু।
কিন্তু সে হঠাৎ বুঝতে পারল - এই এত মানুষের ভিড়েও তার একজন মানুষ নেই।
এমন একজন নেই, যাকে সে এখন ফোন করে বলতে পারে -
“আমার খুব একা লাগছে।”
এই উপলব্ধিটা তার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধল।
সে ফোনটা নামিয়ে রাখল।
তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
অনেকক্ষণ।
কোনো শব্দ নেই।
শুধু নিঃশ্বাসের ভারী শব্দ।
হঠাৎ তার মনে হলো - সে ক্লান্ত।
খুব ক্লান্ত।
শরীর নয়।
হৃদয় ক্লান্ত।
বছরের পর বছর নিজের অনুভূতিগুলোকে চাপা দিতে দিতে, নিজেকে শক্ত দেখাতে দেখাতে, সব দায়িত্ব একা কাঁধে নিতে নিতে - সে ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে গেছে।
তার মনে পড়ল একটা কথা।
একবার তার মা বলেছিলেন -
“মানুষ যত বড়ই হোক, তার জীবনে একটা মানুষ দরকার, যার কাছে সে ছোট হয়ে থাকতে পারবে।”
তখন আকাশ কথাটার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি।
আজ বুঝছে।
আজ তার মনে হচ্ছে - সে কোনোদিন কারও কাছে ছোট হতে পারেনি।
কোনোদিন মাথা রেখে বলতে পারেনি -
“আজ খুব কষ্ট হচ্ছে।”
তার চোখ ভিজে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
যেন কেউ দেখে ফেলবে।
অথচ ঘরে সে একা।
এই একাকীত্বটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
যেখানে মানুষ কাঁদলেও কেউ দেখে না।
চুপ থাকলেও কেউ বোঝে না।
সে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা খুলল।
অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে বসে থাকল।
তারপর লিখতে শুরু করল -
“আজ হঠাৎ মনে হলো, আমি হয়তো কোনোদিন সত্যিকারের বাঁচিনি।”
“আমি শুধু দায়িত্ব পালন করেছি।”
“মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, কাজ করেছি, সফল হয়েছি।”
“কিন্তু নিজের হৃদয়ের পাশে কোনোদিন দাঁড়াইনি।”
কলম থেমে গেল।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।
সে আবার লিখল -
“আমি জানি না ভালোবাসা কেমন।”
“কেউ কোনোদিন আমার হাত ধরে বলেনি -‘আমি আছি।’”
“আমিও কাউকে বলিনি -‘থেকে যাও।’”
“হয়তো এটাই আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।”
একফোঁটা জল ডায়েরির পাতায় পড়ে দাগ হয়ে গেল।
আকাশ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সেই দাগটার দিকে।
তার মনে হলো - এই দাগটা যেন তার পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবি।
অস্পষ্ট।
নিঃশব্দ।
অপূর্ণ।
সেদিন রাতে সে প্রথমবার নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ভয় পেল।
কারণ আজ সে বুঝতে পারছে - এই শূন্যতা শুধু একা থাকার নয়।
এই শূন্যতা অনুভূতি হারিয়ে ফেলার।
পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের চোখের নিচের কালো দাগ দেখল।
ক্লান্ত মুখ।
অবসন্ন চোখ।
সে নিজেকে দেখে মনে মনে বলল -
“মানুষ আমাকে শক্ত ভাবে।”
“কিন্তু আমি ভেতরে ভেতরে কতটা ভাঙা, সেটা কেউ জানে না।”
সেদিন তার অনেক কাজ ছিল।
একটার পর একটা মিটিং।
ফোন কল।
লেনদেন।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল।
কিন্তু সে লক্ষ্য করল - আজ তার হাসিটা আরও বেশি কৃত্রিম লাগছে।
সে কথা বলছে, কিন্তু মন নেই।
মানুষের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু অনুভব করছে না।
একসময় দুপুরে সে নিজের কেবিনে একা বসেছিল।
হঠাৎ বাইরে একটা ছোট্ট বাচ্চার হাসির শব্দ শুনতে পেল।
তার এক কর্মচারী তার মেয়েকে নিয়ে এসেছে।
ছোট্ট মেয়েটা বাবার হাত ধরে হাসছে।
বাবাও হাসছে।
সেই দৃশ্যটা দেখে আকাশের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল - সে এমন একটা জীবনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেটা তার কোনোদিন হবে না।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ অন্ধকার ঘরে বসে ছিল।
কোনো আলো জ্বালায়নি।
অন্ধকারের ভেতরে বসে থাকতে তার ভালো লাগছিল।
কারণ তার মনে হচ্ছিল - এই অন্ধকারটাই তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী।
হঠাৎ সে খুব গভীর একটা সত্য অনুভব করল।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার একা থাকা নয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো -
কারও অভ্যাস না হয়ে ওঠা।
সে কখনো কারও প্রয়োজন হয়ে উঠতে পারেনি।
কেউ তার অপেক্ষায় ঘুম হারায়নি।
কেউ তার কষ্ট বুঝে নীরবে পাশে বসেনি।
কেউ তার অনুপস্থিতিতে শূন্যতা অনুভব করেনি।
এই উপলব্ধিটা তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিল।
সে আবার ডায়েরি খুলল।
এইবার তার হাত কাঁপছিল।
সে লিখল -
“আমি আজ বুঝলাম, ভালোবাসাহীন হৃদয় শুধু নিঃসঙ্গ হয় না - একসময় অনুভূতিহীনও হয়ে যায়।”
“আমি হাসি, কথা বলি, মানুষের পাশে দাঁড়াই।”
“কিন্তু আমার ভেতরে যেন কিছুই আর নড়ে না।”
“আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি ?”
প্রশ্নটা লিখেই সে থেমে গেল।
তার মনে হলো - এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না।
রাত আরও গভীর হলো।
বাইরে বাতাস বইছে।
জানালার পর্দা দুলছে।
আকাশ ধীরে ধীরে মাথাটা দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হচ্ছিল- তার পুরো জীবনটা যেন একটা দীর্ঘ করিডোর।
যেখানে অনেক মানুষ এসেছে, গেছে, কথা বলেছে -
কিন্তু কেউ থেমে থাকেনি।
আর সেই করিডোরের একেবারে শেষে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজে।
একটা ভালোবাসাহীন হৃদয় নিয়ে।
যে হৃদয় আজ প্রথমবার নিজের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছে।
সেই রাতের শেষে ডায়েরির শেষ পাতায় সে শুধু একটা লাইন লিখল -
“আমি কখনো কাউকে বলিনি আমাকে ভালোবাসতে… হয়তো এ কারণেই কেউ থাকেনি।”
বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
কিন্তু আকাশের ভেতরে এখনো গভীর রাত।
(চলবে - পঞ্চম ও শেষ পর্বে আকাশ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যের মুখোমুখি হবে, যেখানে সে বুঝবে - সব ভালোবাসা পাওয়া যায় না, কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভব করেই বেঁচে থাকতে হয়…)





